সাগরপাড়ের বাংলাদেশ

লেখাঃ রতনলাল বিশ্বাস

বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২

(এতো ভ্রমণ নয়, এ হলো উৎসে ফেরা। কবেকার সেই ফেলে আসা কান্নাভেজা মাতৃভূমি । মায়ের কাছে দীর্ঘশ্বাস । জীবনের অনেক হারিয়ে যাওয়া রং, শীতের ভোরে গভীর কুয়াশার মধ্যে হাঁটা, ভরা বর্ষায় আদিগন্ত জল, কোজাগরী পূর্ণিমায় সারা রাত জেগে থাকার এক বিস্ময়কর আনন্দ পাওয়া আর না-পাওয়ার এক মহাকাব্য । সেই মহাকাব্যের সুরের সন্ধানে এই পথ চলা। খুব কম সময় এই চলা সাগরপাড়ের বাংলাদেশে; যা আমার কাছেও মাতৃভূমি, আমার মায়ের কাছেও মাতৃভূমি ।।

কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূল অঞ্চলে বেড়ানোর উদ্দেশে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০১ সকালে বেরিয়ে পড়লাম। করুণাময়ী থেকে বাস ছাড়ল সকাল সাড়ে সাতটায় । আমাদের এই বেড়ানোটা একটু অন্যরকম। কখন বেড়াবো সাগরপাড়ে পায়ে হেঁটে আবার কখন সাগরে নৌকো চেপে। বনগা ছাড়িয়ে হরিদাসপুর (পেট্রাপোল) পৌঁছুলাম সাড়ে নয়টায় । হরিদাসপুর-বেনাপোল বর্ডারে সরকারি কাজকর্ম মিটিয়ে বাস ছাড়ল সাড়ে এগারোটায় । খানাখন্দহীন মসৃণ রাস্তা। যশোর হয়ে দুপুর দেড়টায় বাস থামল মাগুরায়। এখানেই দুপুরের খাওয়ার বিরতি। বিরতির পর ফরিদপুর হয়ে পৌছে গেলাম পদ্মানদীর ধারে । পদ্মা পেরোতে হবে। বাস নেমে এল জেটিতে। গাড়ি, লোকজনের চলাফেরা, তিনতলা ডেক নিয়ে বার্জ জমজমাট। এমনকি পদ্মার ইলিশ ও চিতল মাছও পাওয়া যাচ্ছে। ডেকের দোতলায় খাবার হোটেল। হোটেলে খেতে খেতে পদ্মা পেরোনো যেতে পারে । উঠে এলাম। তিনতলায় । দেখলাম পদ্মানদীর বিস্তার। বিস্তীর্ণ চড়ায় একটা খাড়ি। ওরই মধ্যে দিয়ে পৌছুতে হবে মূল নদীধারায় । নদীর ওপার খুবই অস্পষ্ট । বহু লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা, বার্জ যাতায়াত করছে প্রতিনিয়ত। ডেকে দাঁড়িয়ে যখন এইসব দেখছিলাম তখন আলাপ হলো একজন শিক্ষকের সঙ্গে। উনি ঢাকা শহরে একটি মেয়েদের স্কুলে পড়ান । বার্জ ছাড়ল সাড়ে চারটায় । শিক্ষক মহাশয় প্রথম আলাপেই বললেন ‘দ্যাখছেন আপনারা ফারাক্কার বাঁধ দিয়া পদ্মার কি দুরবস্থাই না করছেন। চারদিকে শুধু চড়া আর চড়া। বললাম ‘আমাদের হুগলি নদীর পরিণতিও একই রকম। দুপাশের চড়ার মধ্যে দিয়ে মিনিট পনেরো পর মূল পদ্মায় পড়লাম । পদ্মা পেরোতে মোট সময় লাগল এক ঘণ্টা ! পৌছে গেলাম আরিচা ঘাটে। মানিকগঞ্জ হয়ে ঢাকা পৌঁছালাম । কলকাতা থেকে বাসে এলাম ৩৮০ কিমি পথ ।।

পরের দুদিন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলে বনধ ডেকেছে সরকারবিরোধী দলগুলো। এখানকার বন্ধ হলো সকাল-সন্ধ্যা। তাই রাতে যাতায়াত কোনো বাধা নেই । অপেক্ষা না করে সেদিন রাতেই সৌদিয়া সংস্থার বাসে রওনা হলাম কক্সবাজার অভিমুখে। এক অসাধারণ সুন্দর চওড়া রাস্তা ধরে বাস চলল দ্রুতগতিতে। রাতের অন্ধকারে মেঘনা নদীর ওপর ব্রিজ পেরিয়ে কুমিল- ও ফেনী হয়ে বাস থামল চট্টগ্রামে। পৃথিবীর নানা দেশে তৈরি বাস এখানে চলে । মিনি বাসগুলোকে খুবই আরামদায়ক এবং খুবই দ্রুতগামী। কোনোটার গায়ে লেখা আছে “বিরতিহীন’ আবার কোনোটা সামনে লেখা রয়েছে ‘গেট লক’ । বন্দর শহর চট্টগ্রামে আধা ঘণ্টা বিরতির পর আরো ১৫২ কিমি দূরে কক্সবাজার পৌছে গেলাম পরদিন সকালে। বাস মাত্র নয় ঘণ্টায় পেরিয়ে এল ৪১০ কিমি পথ । মিয়ানমার থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে এই শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন ক্যাপ্টেন হিমারকক্স। তারই নামে এই শহরের নাম কক্সবাজার। শহরের মধ্যে দিয়ে চলে এলাম কস্তুরাঘাটে। ভাটার নদীপাড়ে পৌছান বেশ কঠিন কাজ। কাঠের জেটির ওপর দিয়ে খানিকটা এগিয়ে উঠে পড়লাম একটা ডিঙ্গিতে। জল নেই। এক হাঁটু কাদার ওপর দিয়ে মাঝিরা নৌকো ঠেলে দিয়ে পৌঁছে দিল নদী পাড়ে জলের কাছে। উঠে পড়লাম একটা স্পিড বোটে । যাব মহেশখালী দ্বীপে। দ্রুতগামী স্পিড বোট নদীর মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়ল সাগরে । সাগরের মাঝে অল্প অল্প ঢেউ কাটিয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যেই পৌছে গেলাম মহেশখালী। নৌকো যথারীতি পাড়ে পৌছাল না । এপাড়ে অবশ্য অন্য ব্যবস্থা। জল কাদার মধ্যে রাখা আছে একটার পর একটা নৌকো । তারই ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে এলাম মহেশখালী। দ্বীপটি বেশ বড় । বহু লোকজনের বসবাস। আমাদের এখানকার সাগরদ্বীপের মতো। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হোটেলে নয় । হাসপাতাল চত্বরে এক আত্মীয়ের কোয়ার্টারে ঢুকে পড়লাম।

এই দ্বীপে এখনো অল্পসংখ্যক মগ বা ব্রহ্মদেশীয় বৌদ্ধরা বসবাস করছে। আছে তিনটি বৌদ্ধবিহার । এদের মধ্যে দক্ষিণ মগপাড়ার বড় রাখাইন বৌদ্ধবিহারটি খুবই সুন্দর । সোনালি রঙের দুটি স্থূপ নিয়ে সাজানোগোছানো বৌদ্ধমন্দির। এটি তৈরি হয়েছিল ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে। বড় ঝুপটির পরিধি ৪৫ ফুট। প্রতিটি বিহারে কয়েকজন করে লামা ও শিক্ষানবিস লামা বসবাস করছে । মন্দিরের ভেতরটা খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । মন্দিরের সামনে মগদের একটা ছোট্ট বাজার। এদের চেহারা বাঙালিদের মতো নয়। চেহারায় বর্মীয় ছাপ আছে। গ্রামের মধ্যে দিয়ে উঠে এলাম মৈনাক পাহাড়ের ওপরে। এরই ঢালে ১৬০ বছরের পুরোনো আদিনাথ মন্দিরটি অবস্থিত। পাহাড়ের ওপর থেকে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায় । সাগরপাড়ে ম্যানগ্রোভ বনানী । বাংলাদেশের ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য স্থানগুলোর মূলত মন্দির ও বৌদ্ধবিহারগুলোকে কেন্দ্র করে। এদের মধ্যে আদিনাথের হিন্দুমন্দিরটি উলে-খযোগ্য । মন্দিরের মধ্যে আছে শিব ও দুর্গার বিগ্রহ ।।

পরদিন ঘন কুয়াশায় ঢাকা সকালে চলে এলাম মহেশখালী সৈকতে। জোয়ারে জল বেলাভূমিকে স্পর্শ করলেও ভাটায় জলরেখা সরে যায় অনেকটা দূরে । তখন চড়ের ওপরে পড়ে থাকে সারি সারি ছোট বড় নৌকো। কুয়াশার মধ্যে আটকে থাকা সেই নৌকাসমেত তটভূমিকে দারুণ লাগে। এ যেন এক অসাধারণ সাদাকালো ছবি । মহেশখালী থেকে স্পিডবোটে রওনা হলাম সোনাদিয়া দ্বীপ অভিমুখে । মহেশখালী লাগোয়া দক্ষিণ দিকের এই দ্বীপটি খুবই সুন্দর। সোনালি সৈকতে সাগরের উত্তাল তরঙ্গ আছড়ে পড়ছে । পর্যটকহীন সৈকতে ছড়িয়ে রয়েছে রং-বেরঙের ঝিনুক ও শামুক। ২০ বর্গ কিমি পরিমিত দ্বীপটিতে মাছ শুকিয়ে শুটকি করা হচ্ছে অনেক জায়গাতেই । রূপচঁাদা ও লাক্ষা মাছের শুটকি তৈরি হচ্ছে যত্নসহকারে । ফিরে এলাম কক্সবাজার । গাড়িপথে ২০ কিমি দূরে রামু । এখানে বড়য়াদের কয়েকটি বৌদ্ধবিহার রয়েছে। একই ধরনের কাঠের তৈরি প্যাগোডার ওপর টিনের ছাউনি। দোতলার আধো অন্ধকার ঘরের মাঝখানে বৌদ্ধমূর্তি । লামাপাড়ার গম্বুজটি বেশ বড়। রয়েছে হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। পৌছে গেলাম রামকোট। বন মধ্যে একটা পাহাড়ের মাথায় এই বৌদ্ধমন্দিরটি তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩০৮-এ। মন্দিরটিতে চাকচিক্য না থাকলেও এর ঐতিহাসিক মূল্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফিরে এলাম কক্সবাজার বৌদ্ধবিহারে । অনেকটা এলাকাজুড়ে কয়েকটি প্যাগোডা সম্মিলিত বৌদ্ধ বিহারটি দেখে বিকেলে পৌছালাম কক্সবাজার সৈকতে। এই সৈকত হলো কক্সবাজারের মূল আকর্ষণ । দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক এখানে আসেন। সারিবদ্ধ নানারঙের ছাতা, আরাম কেদারা ও প্রশস্ত বেলাভূমি নিয়ে জনাকীর্ণ সৈকত। এখান থেকেই শুরু করব সৈকত পদযাত্রা। পায়ে পায়ে যাব টেকনাফ অভিমুখে ।

ভারতবর্ষের সৈকতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার পায়ে হাঁটার অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে পরদিন কাকভোরে পৌছে গেলাম সৈকতে। ঝাউবন পেরিয়ে নেমে এলাম বেলাভূমিতে। শুরু হলো সৈকত পদযাত্রা। দক্ষিণ দিকে মুখ করে চুপচাপ জনাকীর্ণ সৈকত ছাড়িয়ে চলে এলাম নির্জনে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ ৮০ কিমি বেলাভূমি আরো দক্ষিণে শেষ হয়েছে মোট ১২০ কিমি দূরে। প্রশস্ত সৈকতের বা দিকে। বঙ্গোপসাগরের নিরবচ্ছিন্ন কেউ আছড়ে পড়া দেখতে দেখতে হাঁটতে থাকি। শক্ত বেলাভূমির ওপর দিয়ে জিপ গাড়িও যাতায়াত করে। বাঁ দিকে পাহাড়ের কোল ঘেসে। সেনাবাহিনীর তদারকিতে তৈরি হচ্ছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ডাইভ পথ । নির্জন সৈকতে দু-চারজন লোকের দেখা মেলে। একটু দাঁড়িয়ে আলাপ করি । দু-চারটে কথা হয়। বাঁ দিকে কাছাকাছি গ্রাম নেই। পাহাড় ধুইয়ে নেমেছে ছোট ছোট ঝরনা। সাগরপাড়ের এই ঝরনাগুলোকে দারুণ লাগে । কেরল ও কর্ণাটকের সৈকতে এমনটি দেখা যায়। সাদা মুকুট মাথার ঢেউয়ের আসা-যাওয়া দেখতে দেখতে এগিয়ে চলি। দূরে দু চারটে জেলে নৌকো চোখে পড়ে । নীলাভ সাগরের ঢেউ বালুকাবেলায় আছড়ে পড়ে সৈকত জুড়ে একরাশ আদা ফেনা ছড়িয়ে দেয়। সেনাছাউনি থেকে কয়েকজন আমাদের দিকে এগিয়ে এল । পরিচয়, করমর্দন ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর আবার চলা। দুপুরের পর পৌঁছে যাই হিমছড়ি । নারকেল ও সুপুরি গাছের বাগানের মাঝে একটি বাড়ি দেখতে পেয়ে ঢুকে পড়লাম। বাটুমিয়ার থামার বাড়ি। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সাগরপাড়ে এই খামার বাড়িটি অসাধারণ । চৌকিদার আব্দুর করিম চাচা জানিয়ে দিলেন রাত কাটানোর জন্য ঘর পাওয়া যাবে। প্রথম দিনের ১৫ কিমি পায়ে চলা এখানেই শেষ হলো। কক্সবাজার থেকে এখানে সারা দিনের জন্য দলবেঁধে পিকনিক করতে আসে। কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি দল এসেছে পিকনিক করতে। বেলা পড়তেই নেমে এলাম সৈকতে। সূর্যাস্তের রক্তিম আলো সিক্ত বেলাভূমিকে রাঙিয়ে তুলল । রাঙিয়ে তুলল দিগন্তে অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যাওয়া সাগরকে।

কাঠের তৈরি দোতলা বাড়িতে এক নির্জন পরিবেশে রাতটা কাটালাম দারুণ আনন্দে। সৈকত পদযাত্রায় দিনের শেষে কোথায় পৌছব, রাতের আশ্রয় কোথাও পাব, সবই অজানা । পরের দিন হাঁটা শুরু করলাম খুব ভোরে। সামনে রেজু খাল। তাই সাগরপাড়ে জল ছুঁয়ে হাঁটা নয়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা পথ ধরেই দক্ষিণ দিকে হাঁটতে থাকি । পথের বাঁ দিকে গাছপালার ঢাকা পাহাড়। পাহাড়ের কোলে দু-চারটে ঘরবাড়ি । ছোট ছোট ঝরনা নেমেছে পাহাড়ের গা বেয়ে । পথের ডাকনিকে সাগরপাড়ে সবুজ ধানক্ষেত চোখ জুড়ানো সুপারিবাগানগুলোর মাঝে দু-চারটে ঘরবাড়ি । তারই পাশে বেলাভূমি ছাড়িয়ে উত্তাল সমুদ্র। পথের দুপাশে বসবাসকারীরা মাঝে মাঝে আমাদের সম্বন্ধে জানতে চায় । গ্রামের টোলে গাছের ছায়ায় ছেলেমেয়েরা মাথা দুলিয়ে বই পড়ছে আর ছড়ি হাতে ঘুরছে মাস্টার মশাই । এইসব দেখতে দেখতে উঠে এলাম ব্রিজের ওপরে। রেজুখাল পেরিয়ে নেমে এলাম সাগরপাড়ে । বাঁ দিকে সোনারপাড়া ও বেদেলপতা গ্রাম দুটি বেশ বড়। ভাটায় সৈকতের প্রসারতা অনেকটাই বেড়ে যায় । সৈকতজুড়ে পর পর নীল রঙের জাল বাধা রয়েছে বাঁশের সঙ্গে। জোয়ারের সময় এইসব জালের সাহায্যে ধরা হয় চিংড়ি মাছের পোনা। বেলাভূমির রং কোথাও সাদা আবার কোথাও সামান্য কালচে। ঢেউয়ের আসা যাওয়ার মধ্য দিয়ে সৈকতজুড়ে তৈরি হয় সুন্দর আলপনা। সুনীল আকাশ দেখি, অসীম সাগরকে দেখি আর কান পেতে শুনি ঢেউ ভাঙার শব্দ। এ যেন ঢেউয়ের ছন্দে ছন্দে ছন্দময় পথচলা। হঠাৎই এর ছন্দপতন ঘটে। সামনে একটা খাড়ি। খাড়িতে জোয়ারের জল ঢুকছে দ্রুতগতিতে । জলের গভীরতা দ্রুত বেড়ে যায়। অগত্যা বা দিক ঘেঁষে উঠে এলাম ইট বিছানো রাস্তায়। পৌছে গেলাম ইনানী । আজ আর চলা নয়। উপকূলে এই অঞ্চলের গ্রামে মাঝে মাঝেই একটি করে তিনতলা বাড়ি আছে। আমরা ইনামীতে এমনই একটি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় পেলাম অনায়াসেই।

সৈকতের বেশ খানিকটা এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রবাল পথের । ইনানীর এই সৈকত জোয়ারের সময় ১৮০ মিটার হলেও ভাটায় এর প্রসারতা বেড়ে হয় ৩০০ মিটার । পথের ধারে গোটা দশেক দোকান নিয়ে তৈরি হয়েছে একটা বাজার। বাজারে ঢুকতেই লোকজনেরা আমাদের ঘিরে ধরল। পরিচিত হলাম অনেকের সঙ্গে। অনেকেই তাদের বাড়িতে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাল। বেলা পড়তেই কয়েকজন আঞ্চলিক শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে বন বিভাগের ডাকবাংলোটিকে বাঁ দিকে রেখে প্রবাল পাথরে ঢাকা তটভূমিতে চলে এলাম। সূর্যাস্তের জন্য অপেক্ষা করি । সূর্যাস্তের সময় বিস্তীর্ণ সৈকত ও রাশি রাশি প্রবাল পাথরকে রাঙিয়ে সূর্য ডুব দিল বঙ্গোপসাগরে । তারপর শুরু হয়ে যায় আকাশজুড়ে রঙের খেলা। ফিরে এলাম সাইক্লোন শেল্টারের তিনতলার ঘরে।

ভোর হতেই বালিয়াড়ি পেরিয়ে নেমে এলাম সাগরপাড়ে জলের পাশে। ভিজে বালির ওপর দিয়ে এগিয়ে চলি । নীলাভ জলরাশি, আছড়ে পড়া তরঙ্গ আর সাদা ফেনা ছড়িয়ে ঢেউয়ের ফিরে যাওয়া দেখতে দেখতে এগিয়ে চলি। বাঁ দিকে পাহাড়ের কোলে পরপর রয়েছে সফিরবিল, পাটনাটেক ও রূকপাটি গ্রামগুলো । দুপুরে বেশ গরম । বালিয়াড়ির মাঝে ঝাউ বিথির ধার ঘেঁষে দু-চারটে ছাউনি মাঝে মাঝেই দেখা যায় । এমনই একটা ছাউনিতে দুপুরে ঢুকে পড়লাম । জেলেরা সোয়ানখালী গ্রাম থেকে জল এনে দেয়। ভারতের সৈকতের অধিকাংশ অঞ্চলেই ভাষার ব্যবধান ক্ষণিকের জন্য একটা সমস্যা সৃষ্টি করে। এখানে সেই সমস্যা একদমই নেই। আমরা কারা, কী আমাদের উদ্দেশ্য, আমাদের কোন বদ মতলব আছে কি না, এ ধরনের কোনো সন্দেহ মানুষের মনে জাগে না । সকলের সরলতা ও আন্তরিকতা আমাদের মুগ্ধ করে। সৈকতে দুপুরবেলায় লোকজন খুবই কম । নির্জন সৈকতে বেলাভূমি ধরে আবার হাঁটতে থাকি। দু-চারটে নৌকো তুলে রাখা আছে ডাঙায় । সাগরপাড়ে মাছের বড় আকার। বেলা পড়তেই পৌছে গেলাম একটা খাড়ির পাশে। ছোট্ট খাড়িটির ধারে ধারে ঢুকে পড়লাম মনআলি গ্রামে। অল্পদূরে শামলাপুর গ্রাম । মাছের পাইকারি বাজার নিয়ে জমজমাট জনপদ। এখানেই শেষ করলাম তিন দিনের সৈকত পদযাত্রা। হাঁটতে হলো প্রায় ৫০ কিলোমিটার । উঠে পড়লাম ট্রেকার জাতীয় জিপ গাড়িতে। এই গাড়িগুলোকে আঞ্চলিক লোকজনেরা বলে চাঁদের গাড়ি । ছোট্ট গাড়িটিতে যাত্রী ও কয়েক ঝুড়ি মাছ তোলা হলো ছাদে ও বনেটের ওপরে । এই গাড়িতে ৫০-৬০ জন যাত্রী তোলা হয়। আমরা যাচ্ছি তাই কম লোক তোলা হয়েছে । চাঁদের গাড়ি গ্রামের মধ্য দিয়ে পূর্বমুখী পাহাড়িয়া পথ ধরল । সেগুন বনের মাঝে ওঠানামা মেঠো পথ । বনের মাঝে কিছু দরিদ্র মগদের বসবাস চোখে পড়ল। বাঁশের তৈরি মাচা করা ঘরবাড়ি। গিরিশ্রেণি টপকে চলে এলাম হোয়াইক্ষ্যং। এ জায়গাটি হলো চট্টগ্রাম-টেকনাফ পথের ওপরে। এখান থেকে গাড়ি বদলে আর একটা চাদের গাড়ি করে ছুতেই রাত শ্চেম পাশে বঙ্গোপসাগফ বাংলাদেশে ৩৫ কিমি দূরে টেকনাফ পৌছুতেই রাত নেমে এল ।

টেকনাফ জায়গাটি জমজমাট। এর পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগর ও পূর্ব পাশে নাফ নদীর প্রবাহ। নদীর ওপারে অর্থাৎ পূর্বতটে মিয়ানমার। টেকনাফ বাংলাদেশের মূল ভূখ ের দক্ষিণতম জনপদ। শুধু মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যই নয়, এ জায়গাটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় সুন্দর সৈকত, নীলাভ নাফ নদী ও মাতিন কূপ হলো বেড়ানোর জায়গা। আমরা টেকনাফে পৌছেছি অন্য উদ্দেশ্যে ! যাব ৩০ কিমি দূরে সেন্টমার্টিন দ্বীপে। কয়েকটি হোটেলের মধ্যে হলিটপ হোটেলটি বেশ ভালো। থাকা ও খাওয়ার সব হোটেলের প্রতিটি মানুষের আন্তরিকতা ও হৃদয় স্পর্শ করে । পরিচ্ছন্ন হোটেল, অসাধারণ সুন্দর রান্না। বহু হোটেলেই সুস্বাদু শুটকি মাছের প্লেট পাওয়া যায় । এর আগে ধারণাই ছিল না যে শুটকি মাছ খেতে এত ভালো হয়। কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলের লোকজনেরা যদিও বাংলাভাষায় কথা বলছে । কিন্তু ওরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলে সে কথা আমাদের বোধগম্য নয়। সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাবার জন্য বড় মোটর বোটের ব্যবস্থা হলো। আমরা ভারতীয় তাই অনেকেই আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে এল। কেউ সাহস জোগাল । আবার অনেকেই উত্তাল সাগরে নৌকো চেপে যাওয়ার জন্য ভয়ও দেখাল।

ভোরবেলার কাছেই একটা পাহাড়ের মাথায় উঠে পড়লাম । একদা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগ অধ্যুষিত টেকনাফে এখন এদের বসবাস খুবই কম। এই পাহাড়টির ওপরে ছিল নেগান ডাট বৌদ্ধমন্দির ও সাবান বুদ্ধের এক দায়মান মূর্তি। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সেই মূর্তি ও মন্দিরটি ডিনামাইটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত । দায়মান মূর্তিটি এখন কয়েক টুকরোয় শায়িত রয়েছে। প্যাগোডাটি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে । দূরে পূর্বদিকে বয়ে চলেছে। নীলাভ নদী, যার ওপারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দেশ মিয়ানমার। ফিরে এলাম হোটেলে ।

মালপত্র নিয়ে টেকনাফ কালীমন্দিরকে বাঁ দিকে রেখে এগিয়ে চললাম জেটির দিকে । মাঝিকে জিজ্ঞাস করতেই জানাল ‘ভয় পাইবেন না । আইজ হাওয়া নাই । সাগর আজতো পুস্কনী'। ভাটার সময় আর এক বিপত্তি। ডিঙি চেপে বড় নৌকোর কাছে পৌছান বেশ ভয়ের ব্যাপার। এক একজনকে টেনে তোলা হলো বড় নৌকোয় । নৌকো ছাড়ল এগারোটায়। নদীর ওপারে দেখা যায় মিয়ানমারের পর্বতশ্রেণি, ঘরবাড়ি ও একটি বড় বৌদ্ধবিহার । আমাদের নৌকোর ওপর উড়ছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। ক্রমে নদীর মোহনা প্রসারিত হলো। ঢেউও বাড়তে থাকে। ডান দিকে স্থলভাগ ক্রমে মিলিয়ে যেতেই আমরা ঢুকে পড়লাম গভীর সমুদ্রে। জলের রংও হলো আরো বেশি নীল। ঢেউয়ের মাঝে ওঠানামা করতে করতে নৌকো এগিয়ে চলে। আমাদের নৌকায় লাগানো আছে চীন দেশের তৈরি শক্তিশালী মোটর। ফেলে আসা স্থলভাগ ক্রমে মিলিয়ে যায় দিগন্তে । নৌকোয় আলাপ হলো এক যুবকের সঙ্গে। আমাদের নৌকো চেপে যেতে হবে ৩০ কিমি। বাঁ দিকের মিয়ানমারের ভূখ ও অস্পষ্ট হয়ে যায়। এখন আমরা গভীর সমুদ্রে। ধীরে ধীরে এক টুকরো ভূখ স্পষ্ট হলো ! ওটাই সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ । উত্তাল সাগরবক্ষে আড়াই ঘণ্টার এই রুদ্ধশ্বাস যাত্রা শেষ হলো। পৌছে গেলাম সেন্টমার্টিন দ্বীপে। কোনো জেটি নেই। নৌকো নোঙর করল সৈকত থেকে খানিকটা দূরে। ছোট ছোট ডিঙি কাছে আসে । অধৈর্য যাত্রীরা সেই ডিঙির ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে থাকে। এই অব্যবস্থার মধ্যে একটা নৌকো উল্টে গেল । সব ভিজিয়ে কয়েকজন ডাঙায় পৌছুলেন । আমরা সবার শেষে সাবধানে সেই টলমলে ডিঙি চেপে পা রাখলাম দ্বীপের পূর্বতটে । সোনালী বেলাভূমি ও তীব্র নীলাভ টলটলে স্বচ্ছ জল ও তীরে আছড়ে পড়া ঢেউ নিয়ে সেন্টমার্টিন সৈকত অসাধারণ। বেলাভূমির মধ্যে দিয়ে উঠে এলাম লোকালয়ে । বালিয়াড়ি তটে ঝিনুক, শামুক ও প্রবাল দিয়ে তৈরি ঘর সাজানোর নানা জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে রয়েছে। সারিবদ্ধ দোকান । সকল খাবার দোকানের সামনে মাছভাজা রাখা আছে সাজিয়ে ! 

অবকাশ হোটেলটি দ্বীপের পশ্চিমতটে। এ ছাড়া দুটি ছোট হোটেল আছে । উঠলাম Bay (of Bengal Lodge-এ। এ হোটেলটি স্যারের হোটেল বলেই সর্বপরিচিত। প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ও প্রাক্তন পঞ্চায়েত চেয়ারম্যান ৮৪ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ আব্দুল কাশিম চৌধুরী হলো এ হোটেলটির মালিক। উনি পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া শহরে কাটিয়েছেন বহু বছর । ১৯৫৬ থেকে রয়েছেন এই দ্বীপে। কলকাতা ও হাওড়া সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে চান । আমাদের পেয়ে বৃদ্ধ মানুষটি খুব খুশি। বিকেলের নরম আলোয় নারকেল বাগানের মধ্য দিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে পৌছে গেলাম দ্বীপের পশ্চিমতটে। সৈকতজুড়ে প্রবাল পাথরের ছড়াছড়ি। সৈকতের সিক্ত বেলাভূমি, প্রবাল পাথর রাশি ও আদিগন্ত জলরাশিকে রাঙিয়ে সূর্য অস্ত গেল । ১৫০ দিন সৈকতে হাঁটার সুবাদে এ দৃশ্য তো বহুবার দেখেছি। এ ছাড়া সাগর পাড়ে বেড়াতে গিয়েও এ দৃশ্য দেখেছি বারবার। তবুও কখনো পুরোনো হয় না। প্রতিদিনই মনে হয় নতুন কিছু দেখলাম । সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেখতে চলে এলাম দ্বীপটির উত্তরতটে। এক অর্ধচন্দ্রাকার সৈকতে নোঙর করেছে বহু জেলে নৌকো। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরাই এ দ্বীপের বাসিন্দাদের মূল জীবিকা। ফিরে এলাম হোটেলে ।। | আট কিলোমিটার সেন্টমার্টিন দ্বীপের পূর্বে নাম ছিল জিনজিরা। ব্রিটিশ প্রশাসক মার্টিন সাহেব মিয়ানমার থেকে অগত্যা কিছু শরণার্থীর বসতি গড়ে দিয়েছিলেন এই দ্বীপে। দ্বীপটির দক্ষিণ দিকে রয়েছে আরো একটি প্রবাল দ্বীপ । যার নাম ছেড়াদিয়া ! ভাটার সময় দ্বীপটি সেন্টমার্টিন দ্বীপের সঙ্গে যুক্ত থাকে । কিন্তু জোয়ারের সময় হয় আলাদা।

পরদিন ভোররাতে বেরিয়ে পড়লাম ছেড়াদিয়ার উদ্দেশে । সেন্টমার্টিন ও ছিড়াদিয়া দ্বীপ দুটিকে পরিক্রমা করব । সোনালি সৈকত ও সৈকতজুড়ে রাশি রাশি প্রবাল পাথর । দ্বীপের পূর্বপান্ত ছুঁয়ে এগিয়ে চলি দক্ষিণ দিকে। সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে দ্রুত চলা । জোয়ার শুরু হবার আগেই বেরিয়ে আসতে হবে ছিড়াদিয়া দ্বীপ থেকে। ডান দিকে বেলাভূমির ধারে ধারে নারিকেল বাগানের মাঝে দু-চারটি ঘরবাড়ি । গ্রামের লোকজন ওদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। চা খাইয়া যান, আপনারা বাঙ্গালী, আমরাও বাঙ্গালী । বিদেশি হলেও আমরা ওদের আপনজন । সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ প্রান্তে একটা ছোট্ট খাড়ি রয়েছে। হাঁটু জল ভেঙে উঠে এলাম এক সংকীর্ণ দ্বীপে। এটাই ছিড়াদিয়া । দিগন্ত বিস্তৃত উত্তাল সাগরের মাঝে এক টুকরো স্থলভূমি । বেলাভূমির মাঝ বরাবর সামান্য ঝোপ। জলের ধারে রাশি রাশি প্রবাল পাথর। ঢেউ আছড়ে পড়ে সেইসব পাথরের ওপরে 1 পৌছে গেলাম দ্বীপটির দক্ষিণ প্রান্তে। বাংলাদেশের শেষ ভূখ। নানা প্রজাতির প্রবালের ছড়াছড়ি। দ্বীপের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে হলো মহাসমুদ্রের মাঝে এক টুকরো খরকুটোর ওপর দাঁড়িয়ে আছি । এখান থেকে ৩৪০° থেকে ৩৫০° সাগরকে দেখা যাচ্ছে ! সে এক অনন্য অনুভূতি। জোয়ার শুরু হয়েছে। দ্রুত ফিরে যেতে হবে। নতুবা বিচ্ছিন্ন হয়ে এই জনমানবহীন ছিড়াদিয়া দ্বীপে অপেক্ষা করতে হবে ভাটার জন্যে। ফিরে এলাম সেন্টমার্টিন দ্বীপে! এসেছিলাম পূর্বতট ছুঁয়ে আর ফিরা পশ্চিম তট ধরে। ডানদিকে কেয়া বন ও বা দিকে কখনোসোনালি বেলাভূমি ধরে আবার কখন নানা রঙের পাথরের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলি উত্তর দিকে। অর্ধচন্দ্রাকার সৈকতে নানারঙের ঝিনুক ও শামুক কুড়োতে কুড়োতে দুপুর নাগাদ পৌছে গেলাম অবকাশ হোটেলের কাছে। ফিরে এলাম স্যারের হোটেলে। এখানে প্রতিমুহূর্তে মনে হয়েছে আমরা অপরিচিত নই, আমরা স্যারের বাড়ির অতিথি । স্যার ও স্যারের ছেলে সর্বক্ষণই আমাদের সঙ্গে গল্পে মেতে আছে । শীতের মৌসুমে সাগর যখন অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকে তখন এখানে কিছু পর্যটক আসে। মার্চ থেকেই সাগর উত্তাল হয় । তখন সেই ঢেউ কাটিয়ে শুধু জেলেদের চলাফের! । কাশিম চাচার আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা অতুলনীয়। হোটেলে ভাড়া মেটাতে গিয়ে আর এক বিপত্তি। উনি কিছুতেই ভাড়া নিলেন না। ফিরে এলাম সাগরপাড়ে! জেলেরা নৌকোবোঝাই করে মাছ নিয়ে এসেছে। তারপর সব মাছ গোল করে সাজানো হলো বালির ওপরে । সেই বৃত্তের ব্যাস মেপে মাছের দাম নির্ধারিত হলো। সৈকত পদযাত্রার এমনটি কখনো দেখিনি। বিকেলে সাগরের জল আরো বেশি নীলবর্ণ। যেন সাগরে কেউ নীল কালি ঢেলে দিয়েছে । জলের এই রং দেখে মন ভরে যায়। নৌকো ছাড়ল সাড়ে তিনটায় । সৈকতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে বৃদ্ধ আব্দুল কাশেম চৌধুরী। বেড়ানোর আনন্দের মধ্যেও একজনকে ছেড়ে যাবার বেদনা অনুভব করলাম। কাশেম চাচার একটা কথা বারবার মনে পড়ল, বাংলা ভাগের কোনো মানে হয় না । এত দেশ ভাগ নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে ভাগাভাগি । নৌকা এগিয়ে চলে উত্তর দিকে। পেছনে কিছুক্ষণের মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে যায় সেন্টমার্টিন দ্বীপ । বিকেলে বেশ হাওয়া উঠেছে । সাগর আজ বড়ই উত্তাল । ৬০ জন যাত্রী নিয়ে সেই ঢেউয়ের রাজ্যে নৌকো ওঠানামা করছে। উত্তাল তরঙ্গ আছড়ে পড়ে নৌকোর গায়ে। ছিটকে ওঠা জল মাঝে মাঝেই ভিজিয়ে দেয় যাত্রীদের। ভরা জোয়ারে সাগর যেন ফুসে উঠেছে । কাছাকাছি কোনো নৌকো দেখা যায় না। এক নৌকাযাত্রীসমেত তখন আমরা নিঃসঙ্গ। ঢেউয়ের মাঝে নৌকোর এই ওঠানামায় যাত্রীরা সকলে ভয় পেলেও মাঝিরা শক্ত হাতে হাল ধরেছে। রীতিমতো চমক দিয়ে বলল, ‘একদম ভয় পাইবেন না।' তখন একটাই কাম্য যে কখন দেখতে পাব মূল ভূখণ্ডের স্থলভাগ ।

সকলেই চুপচাপ। বারবার নৌকো দূরে উঠছে । সকলের দৃষ্টি উত্তর দিকে আবদ্ধ । কখন দেখতে পাব মূল ভূখ। ধীরে ধীরে ডান দিকে অস্পষ্ট পাহাড়িয়া অঞ্চল ভেসে উঠল। ওটাই মিয়ানমারের আরাকান পর্বতশ্রেণি। টেকনাফের শেষ ভূখণ্ডও দেখা গেল । নৌকা নাফ নদীর মধ্যে ঢুকে পড়ল। এখানে মোহনাকে সাগর বলেই মনে হয়। নাফ নদীর মাঝে নৌকো ভ্রমণ খুবই আনন্দের। সে এক অন্য অনুভূতি । নীলাভ উত্তাল জলরাশির দুপাশে দুটি দেশ। দুটি দেশের এই অংশে একই প্রকৃতি কিন্তু ভাষা, ধর্ম ও লোকজনের চেহারায় রয়েছে অনেক পার্থক্য। টেকনাফ পৌছালাম, তখন সন্ধ্যা ছয়টা। এরপর যাব পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্দরমহলের জলে জঙ্গলে। সে এক অন্য ভ্রমণ ।।

 

বিশাল সমুদ্র, অনেক দ্বীপ, উজ্জ্বল তটভূমি ! ভাষা বাংলা। সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে হাঁটা হয়নি এবার। সমস্ত সময় ভেসেছি ভালোবাসায়, ভ্রাতৃত্ববোধে আর আন্তরিকতায় ।