পর্যটন আইন: উদ্ভব এবং বিকাশ

লেখাঃ মো. জামিউল আহমেদ

বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২

আজকাল লক্ষ-কোটি মানুষ অহরহ দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন । অথচ এদের বেশির ভাগই এই বেড়ানোর পেছনের রহস্য সম্পর্কে অবহিত নন। বেড়ানো প্রকৃত অর্থে একটি মনোদৈহিক ব্যাপার । মন সায় না দিলে অর্থাৎ মনমানসিকতা বেড়ানোর অনুকূলে

থাকলে কোথাও বেড়ানো সম্ভব হয় না। আবার মন সায় দেয়ার পরও সময়, অর্থ এবং স্বাস্থ্য ইত্যাদি ব্যাপারগুলো সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয় । অর্থাৎ এর একটির অনুপস্থিতি বেড়ানো বা ভ্রমণকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। এসব ঠিক-ঠাক থাকলেও বেড়ানো সম্ভব

-ও হতে পারে, যদি না বেড়ানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত সেবাপ্রাপ্তির উপাদানগুলো নিশ্চিত না করা যায়। এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে – যানবাহন, আবাসন, খাবার-দাবার, বিনোদন। ইত্যাদি, যা নিজ-উদ্যোগে অথবা অন্যের সাহায্য নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিংবা আগে থেকেই নিশ্চিত করে নিতে হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বেড়ানোর জন্য মনস্থির করা বা ইচ্ছাপোষণ করা, শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকা, অর্থের সংস্থান করা, হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকা এবং সর্বোপরি মূল উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে-যে সার্ভিস বা সেবা দরকার, তা নিশ্চিত করা গেলেই শুধু সফলভাবে বেড়ানো বা ভ্রমণ করা সম্ভব। তাই আধুনিক বিশ্বে মানুষের বেড়ানো বা ভ্রমণ বিষয়ক এসব কর্মকাণ্ডকে একসঙ্গে যে পরিভাষা দ্বারা বোঝানো হয়ে থাকে, তারই নাম হচ্ছে পর্যটন’ । অতএব, স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ভ্রমণ বিষয়ক কর্মকাণ্ড বলি আর পর্যটন বলি, তা শতভাগ সেবানির্ভর একটি বিষয়, যা আজ সার্বিক বিচারে শুধু শিল্পই নয়, একক সর্ববৃহৎ শিল্পের স্থান দখল করে আছে ।

পর্যটন কবে কার সময়ে কীভাবে তার যাত্রা শুরু করেছিল, সেই ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি না করেও বলা যায়, আধুনিক পর্যটন আন্তর্জাতিকতা লাভের মধ্য দিয়ে মাত্র গত শতকের মধ্যভাগে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে এবং বিকশিত হতে থাকে। প্রয়োজন দেখা দেয় পর্যটনের এই ব্যাপক প্রসারকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসার । তাই শুরু হয় নতুন-নতুন নিয়ম-কানুন প্রবর্তনের সংস্কৃতি, যা পর্যটনকে স্বাভাবিক নিয়ম-কানুনের মধ্যে নিয়ে এসে শৃঙ্খলিত করতে থাকে এবং ধীরে-ধীরে আইনি কাঠামোর মধ্যে আসতে বাধ্যকরে । কেন না কেবল আইনই পারে মানুষের আচার-আচরণকে শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে, যা সার্বভৌম কর্তৃক প্রয়োগ ও কার্যকর করা হয়ে থাকে। তাহলে প্রশ্ন হলো, মানুষের ভ্রমণ বিষয়ক কর্মকাণ্ড তথা পর্যটনের সাথে আইনের ব্যাপারটি এল কী করে? আমরা জানি মানুষ নিজ উদ্যোগে অথবা অন্যের প্রচার-প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এক স্থান থেকে অন্য কোনো নতুন স্থানে ভ্রমণে গিয়ে থাকে। অর্থাৎ পর্যটন সম্পর্কিত পণ্য বলি আর সেবা বলি সে-সম্পর্কিত বর্ণনার উপর নির্ভর করেই কেবলমাত্র তাকে এগুতে হয়। অথচ এই নির্ভরশীলতার পেছনে ভরসা করতে হয় যে বিষয়টির উপর তা হচ্ছে স্রেফ একগুচ্ছ অঙ্গীকার বা প্রমিজ (Promise)। আবার এই অঙ্গীকার বা প্রমিজই যদি অপরপক্ষ রক্ষা না করে তাহলে সব আয়োজনই জলে যেতে বাধ্য। তাই ভ্রমণকারী মানুষ তথা পর্যটকের সাথে অঙ্গীকার বা প্রমিজ ভঙ্গের মাধ্যমে কেউ যাতে প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য রক্ষা কবচ হিসেবে থাকে এই আইন যা উভয় পক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক। সেজন্য বলা হয়ে থাকে সার্বিকভাবে ভ্রমণ বিষয়ক কর্মকাণ্ড তথা পর্যটন অত্যন্ত আইন নির্ভর একটি মাধ্যম, যা আমাদের কাছে পর্যটন আইন হিসেবে পরিচিত এবং ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও ব্যবহৃত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে পর্যটক তথা ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে পর্যটন আইন যেমন একটি হাতিয়ার তেমনি সার্বিক পর্যটন ব্যবস্থাপনায়ও তা অধিক কার্যকর । যেজন্য পৃথিবীর বহু দেশই পর্যটন আইনের দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পর্যটন উন্নয়ন প্রয়াসী অন্য দেশগুলোও নতুন-নতুন আইন প্রণয়নে ব্যস্ত । অর্থাৎ বলা যায়, যে দেশে পর্যটন আইনের চর্চা যত বেশি সে-দেশের পর্যটনও তত উন্নত। এই প্রসঙ্গে আমরা বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারি। এখানে পর্যটন-চর্চার শুরু সেই ষাটের দশক অর্থাৎ তৎকালীন পাকিস্তান আমল থেকেই । তবে বাংলাদেশের জন্মলাভের পর ১৯৭২ সালে ‘দি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন অর্ডার দিয়েই পর্যটনের যাত্রা শুরু। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে পর্যটন উন্নয়ন বলতে যেমনি কিছু হয় নি তেমনি কোন সরকারই সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইন প্রণয়নের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। তবে ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট বিষয়ে যে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল তাও আবার অত্যন্ত দূর্বল ও নিম্নমানের হওয়ার পাশাপাশি যুগোপযোগীতার ছোঁয়াও পায় নি। ফলে সীমিত কলেবরের এসব আইন অত্যন্ত পরিবর্তনশীল পর্যটন শিল্পের সাথে তাল মেলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে । পাশাপাশি পর্যটন সেব প্রতিষ্ঠানসমূহের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ, ভ্রমণ পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণ, সেবাগ্রহণকারী তথা ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ ইত্যাদি পর্যটন সম্পৃক্ত বিষয়ে সরাসরি নতুন কোন আইন প্রণীত না হওয়ায় গোটা পর্যটন শিল্পই স্থবির হয়ে পড়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে। উপরন্ত বিশ্বজনীনভাবে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত এবং যথাযথ আইনি কাঠামোর মধ্যে সৃষ্ট জাতীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষের আদলে কোন কর্তৃপক্ষ না থাকায় আজ অবধি পর্যটন রয়েছে অরক্ষিত ও অভিভাবকহীন। এমতাবস্থায় পর্যটন শিল্প পায়নি যথাযথ আনুকূল্য, হয় নি উন্নয়ন এবং পর্যটন আইনের প্রচলন । অথবা যথাযথ পর্যটন আইন প্রণয়ন এবং তা চর্চা নিশ্চিত না করতে পারাটাই আমাদের পর্যটন উন্নয়নকে করেছে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ ।যা হোক, ইদানীংকালে পর্যটন একটি বিশাল শিল্প মাধ্যম যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যবস্থাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। শুধু দেখা নয়, জানা ও শেখার মাধ্যম হিসেবে এর ব্যাপক ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাথে সাথে এর সাথে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠি, পণ্য ও সেবা ভারি অবিশ্বাস্যভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে। তার সাথে যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে এর উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং আধুনিকিকরণ আরো বেশি বেশি বেগবান হচ্ছে।ফলশ্রুতিতে সার্বিকভাবে প্রায়োগিক নিয়ন্ত্রণ অতিমাত্রায় জরুরী হয়ে পড়েছে। কেন না সরবরাহকারী, খুচরা বিক্রেতা, ভোক্তা এমনকি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও নিজের এবং প্রতিপক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারে আরো অধিক যত্নবান না হয়ে টিকে থাকতে পারে না বা পারছে না। এক্ষেত্রে শক্তিশালী পর্যটন আইন সরাসরি তার সাহায্যের হাত প্রসারিত করে এক দূর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরী করেছে। তাই একদিকে যেমনি নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কার্যকর আইনী কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে ঠিক তেমনি অন্যদিকে সর্বপ্রকার সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্ম-পরিধি ও আচরণ বিধি এবং সেবার গুনগত মাননিয়ন্ত্রণ সহায়ক বিধি-বিধানও আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে । এতেকরে একজন পর্যটক বা ভোক্তাও নিজ স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি তার করণীয় সম্পর্কে নির্দেশিত হয়ে আইনের আওতার মধ্যে আচরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে, দেশ কিংবা অঞ্চল ভেদে এন টি ও বা জাতীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষ, পর্যটন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ট্যুরিজম বোর্ড ইত্যাদি যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন তাদের উদ্দেশ্য কিংবা লক্ষ্য বলতে গেলে একই রকমের হয়ে থাকে। এভাবে সেবা প্রতিষ্ঠান বা মূল সরবরাহকারী, খুচরা বিক্রেতা, আয়োজক বা পরিচালক ইত্যাদির নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ এবং সেবার গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ বিষয়ক আইনও যে নামেই অভিহিত হয়ে থাক না কেন তাদের সবার উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য বহুলাংশে একই সূতোয় গ্ৰতিত। কারণ নিজ নিজ প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পর্যটনের ছায়াতলে জায়গা করে নেয়া ছাড়া রাষ্ট্রসমূহের জন্য পর্যটন উন্নয়নের চিন্তা করাই আজকাল মুশকিল।

এসব কারণেই বিশ্বের প্রতিটি দেশ পর্যটকের স্বার্থ সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের ব্যাপারটিকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে । যেজন্য নিজ দেশের প্রচলিত আইন, আন্ত র্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন, বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা থেকে উৎসারিত কোন আইন, আস্ত র্জাতিক চুক্তি নির্ভর আইন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুশাসন নির্ভর প্রচলিত আইন ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে আধুনিক এবং যুগোপযোগী পর্যটন আইন প্রণয়ন করে তা প্রয়োগ করার করার জন্য দেশ সমূহ আরো অধিক মনযোগী হয়ে পড়েছে। কারণ কোন একটি বিশেষ দেশকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নিজেকে আন্তর্জাতিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। যার ফলে ভ্রমণ আইন, প্যাকেজ ট্যুর আইন, আবাসন আইন, রেস্তোরা আইন, পাসপোর্ট ও অভিবাসন আইন, পরিবেশ আইন ইত্যাদির পাশাপাশি বিমান নিরাপত্তা, সড়ক নিরাপত্তা, ট্যুরিস্ট কোচ নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, পর্যটক নিরাপত্তা, পর্যটক পুলিশ, সন্ত্রাস নিরোধ, ব্যাগেজ, স্বাস্থ্য ও বীমাসহ কতো না নতুন নতুন বিষয় পর্যটন আইনকে দিন দিন সমৃদ্ধ করছে তার ইয়ত্ত্বা নেই। তাই সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজনে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ আইনের পাশাপাশি পর্যটন উন্নয়নের উদ্দেশ্যে নীতিমালা প্রণয়ন এবং সেবার গুণগতমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আচরণবিধি প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয় পর্যটন শিল্পের জন্য এখন নেহায়েত প্রাথমিক কাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এজন্য সংসদ প্রণীত আইন কিংবা অধ্যাদেশ, বিধি-বিধান কিংবা আচরণ বিধি, নির্দেশনা কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশ, প্রচলিত রীতি-নীতি কিংবা প্রথা ইত্যাদি যাই প্রয়োগ করা হোক না কেন তা প্রকারান্তরে পর্যটন আইনের হাতকে করছে আরো শক্তিশালী । ফলশ্রুতিতে একদিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের ভিত আরো মজবুত হচ্ছে এবং অন্যদিকে সেবা প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রদানকারী ও সেবা গ্রহণকারী তথা পর্যটকের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি প্রত্যেকেই নিজ নিজ করণীয় সম্পর্কে অগ্রিম সতর্ক হতে পারছে । যা পর্যটন শিল্পের মত শতভাগ সেবানির্ভর একটি বিশাল ও বিস্তৃত বিষয়ের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একান্তই অপরিহার্য।

এ প্রসঙ্গে অবশ্য মনে রাখতে হবে যে, পর্যটন আইন শুধুই কোন তাত্ত্বিক বিষয় নয়। যা কি না নিছক জানাজানি কিংবা অধ্যয়নের বিষয় মাত্র। উপরন্তু পর্যটন আইনকে বলা হয়ে থাকে অত্যন্ত বাস্তব সম্মত অথচ পরিবর্তনশীল একটি নিত্য দিনকার ব্যবহারিক বিষয় যা কেবলই চর্চার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকে । বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভের জন্য দু-একটি উদাহরণ টেনে দেখা যেতে পারে। ধরা যাক ‘ক’ নামের ব্যক্তিটি ‘খ’ হোটেলে অবস্থানকালে তার কিছু মূল্যবান জিনিস হারালেন । এক্ষেত্রে ‘ক’ কি আইনগত কোন প্রতিকার পেতে পারেন? হ্যা, অবশ্যই পেতে পারেন এবং তা চুক্তি আইনের মাধ্যমে। তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, (ক) হোটেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মালামালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানের বিষয়টি কাউন্টারে নাম নিবন্ধনের পূর্বে কিংবা নিবন্ধনের সময়ে উল্লেখ করা হয়েছিল অথবা (খ) মালামালের নিরাপত্তা প্রদানে হোটেল কর্তৃপক্ষের দায়দায়িত্ব নেই মর্মে কোন নোটিশ দেয়া হয়ে থাকলেও তা কাউন্টারে নাম নিবন্ধনের পর উল্লেখ করা হয়েছিল। কারণ হোটেল কাউন্টারে নাম নিবন্ধন হওয়ার সাথে সাথেই উভয় পক্ষের মধ্যে একটা বৈধ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আর এই চুক্তি সম্পাদনের সময়ে প্রকাশিত বা উল্লেখিত শর্তই কেবলমাত্র যে কোন পক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক। যা আজ থেকে বহু বছর আগে একটি বৃটিশ আদালত ‘ওলে বনাম মার্লবোরো কোর্ট লি: (১৯৪৯) মামলায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। আবার এমন অনেক বিষয় আছে যা সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে একদিকে চুক্তি আইন এবং অন্যদিকে ফৌজদারী আইনের আওতায় একজন পর্যটকের স্বার্থ রক্ষা করে থাকে । ধরা যাক একজন ট্যুর অপারেটর তার প্রচার পত্রে নিশ্চয়তা দিলেন যে, তিনি দক্ষ ড্রাইভার দ্বারা টুরিস্ট কোচ চালিয়ে টুর পরিচালনা করবেন। অথচ অদক্ষ ড্রাইভারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলো এবং ট্যুরে অংশগ্রহণকারী পর্যটক আহত হলেন । এক্ষেত্রে নিশ্চয়তা রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য উক্ত টুর অপারেটরের উপর একদিকে চুক্তি ভঙ্গ এবং অন্যদিকে জেনেশুনে ঝুঁকিপূর্ণ টুর পরিচালনা করে পর্যটককে আহত করার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব বর্তাবে। এই বিষয়টিও একটি বৃটিশ আদালত ‘সান বনাম সোসাইটি এক্সপিডিসনস্ (১৯৯৮)' মামলায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এভাবেই পর্যটন আইনের অধীনে গোটা বিশ্বে হাজার হাজার মামলার মাধ্যমে আদালত কর্তৃক পর্যটকের অধিকার প্রতিষ্ঠা লাভ করছে ।

তাই বিশ্ব জুড়ে অস্বাভাবিকভাবে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তার সাথে নতুন নতুন পর্যটন পণ্য ও সেবা যোগ হওয়ায় প্রচলিত আইনের পরও সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইন প্রণয়ন জরুরী হয়ে পড়েছে। এতে প্রচলিত আইন আরো শাণিত হয়ে যুগোপযোগী হচ্ছে এবং অনেক নতুন নতুন ও অমীমাংসিত বিষয় অন্তর্ভূক্ত হয়ে সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইনকে আরো শক্তিশালী করছে। ফলে ভ্রমণ আইন, প্যাকেজ টুর আইন, ক্রুজ আইন, ট্যুরিস্ট কোচ পরিচালন আইন, ট্যুরিস্ট গাইড আইন, এয়ার প্যাসেঞ্জার আইন, হোটেল এ ব্যাপক ভিত্তিক ভূমিকা রাখছে । তবে উন্নত মানের পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য এই শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি একটি পূর্বশর্ত বলেই তা যতটা সার্থক-সুন্দরভাবে রক্ষিত হয়ে থাকে ততটাই সাফল্য আসে এবং যথার্থ পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব হয়। আর এজন্যই বলা হয়ে থাকে, যে দেশের পর্যটন আইন যতটা উন্নত সে দেশের পর্যটনও ততটা উন্নত। অর্থাৎ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাত্রা নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইন ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে এবং তা বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত ও বাস্তবসম্মত।