চুঙ্গা পিঠার নিমন্ত্রণ

লেখাঃ গাজী মুনছুর আজিজ

বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২

বাঁশের চুঙ্গা বা চোঙার ভেতর চাল ভিজিয়ে ও পুড়িয়ে তৈরি করা হয় বলে এর নাম চুঙ্গা পিঠা। এটি সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার। শীত মৌসুমে এ পিঠা তৈরি হয় এই অঞ্চলের ঘরে ঘরে। তবে আগে অনেক বেশি হলেও এখন কিছুটা কম দেখা যায়।

 

মৌলভীবাজারের বড়লেখার অনুজ বন্ধু নাজমুল এবারের মাঘ মাসে এ পিঠা খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে। তার নিমন্ত্রণে সারা দিয়ে এক সকালে হাজির হই বড়লেখার সুজানগরে। সুজানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নছিব আলীর বাড়িতে পিঠা তৈরির আয়োজন করা হয়। আয়োজনে সহযোগিতা করেন নছিব আলীর বড় ভাই মোমিন আলী, মোখলেস ও আসাব আলী।

 

বাড়ির উঠানে পাটি বিছিয়ে পিঠা তৈরির আয়োজন করা হয়েছে। আগের দিনই সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে পিঠার সরঞ্জাম—বাঁশ, চাল ও পাতা। আমাদের সামনেই চলছে তৈরির কার্যক্রম।

 

যে-বাঁশের চুঙ্গায় চাল ভরা হচ্ছে, সে চুঙ্গাগুলো লম্বায় আড়াই থেকে তিন ফুট। পাহাড়ি এ-বাঁশের প্রকৃত নাম ডুলুবাঁশ। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে এটা চুঙ্গার বাঁশ হিসেবেই বেশি পরিচিত। আর যে-পাতায় মুড়িয়ে চুঙ্গার ভেতর চাল ভরা হয়, সে-পাতার নাম স্থানীয় ভাষায় খিত্তিপাতা। পাতাটি পাহাড়ি এলাকায় পাওয়া যায়। এর আলাদা একটা সুগন্ধ আছে, যা পিঠার বাড়তি আকর্ষণ। এ পাতা না পাওয়া গেলে কলাপাতা দিয়েও অনেকে তৈরি করেন। আর যে-চাল দিয়ে তৈরি করা হয় এ পিঠা তার নাম বিরইন চাল।

 

পিঠা তৈরির নিয়মটা এমন—প্রথমে খিত্তিপাতায় মুড়িয়ে চুঙ্গার ভেতর চাল ভরা হয়, তারপর বাঁশের ভেতর পানি দিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা ভেজানো হয়। ভেজা হলে পাতা দিয়ে বাঁশের খোলা মুখ বন্ধ করে কলাগাছের উপর বাঁশগুলো সারি দিয়ে বিছিয়ে খরকুটো দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। এক থেকে দেড় ঘণ্টা পোড়ার পর বাঁশ থেকে পিঠা বের করা হয়। এ পিঠা খাওয়া হয় মধু, দুধ, রুইমাছ ইত্যাদি দিয়ে।

 

সুজানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নছিব আলী বলেন, মুলত চুঙ্গাপিঠা আদিবাসীদের খাবার। ধীরে ধীরে তাদের কাছ থেকে আমরাও এ পিঠা খাওয়া শুরু করি। এ-অঞ্চলে এই পিঠা তৈরি ক’রে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বা আত্মীয়র বাড়ি পাঠানোর প্রচলন এখনও আছে। পিঠা তৈরি করা হয় সাধারণত সন্ধ্যার পর। আর খাওয়া হয় রাতে সবাই মিলে। তবে আগে এই পিঠা বানানোর প্রচলনটা বেশি ছিল। এখন কিছুটা কম। নাজমুল জানাল, পিঠা তৈরির জন্য শীত মৌসুমে এ-অঞ্চলের বাজারে কাটা অবস্থায় ডুলুবাঁশ বা চুঙ্গার বাঁশ কিনতে পাওয়া যায়। আড়াই থেকে তিন ফুটের এ কাটা বাঁশ প্রতিটি বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকায়।

 

আমাদের সামনেই চাল ভরে ভেজানো হলো। ভিজতে যেহেতু দই-তিন ঘণ্টা সময় লাগবে, সেজন্য আমরা এ সময়টা ঘুরতে বের হই। নাজমুল ছাড়া সঙ্গে আরও যোগ দেয় মুন্না ও শুভ। দুটি মোটরবাইকে আমরা রওনা হই মাধবকুণ্ড ঝরনা দেখার উদ্দেশ্যে। পথে কলাগাঁও বাজারে একটি টি-স্টলে গরুর দুধের চা খাই। দুইপাশে চাবাগান দেখতে দেখতে প্রায় ৩০ মিনিটের মাথায় পৌঁছাই মাধবকুণ্ড।

 

এর আগে একাধিকবার আসা হয়েছে এ ঝরনায়। এবার কতোতম তা বলাটা মুশকিল। তবে ইদানিং মাধবকুণ্ড ঝরনা এলাকার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। পার্কিং-এ মোটরবাইক রেখে টিকিট কেটে আমরা প্রবেশ করি ঝরনা এলাকায়। কিছুক্ষণ হাঁটার পরই চলে আসি ঝরনার সামনে।

 

মাধবকুণ্ড ঝরনাকে কেন্দ্র করেই এলাকাটিকে মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক করা হয়েছে। এই পার্কে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের রেস্টহাউজ ও রেস্টুরেন্ট আছে। নতুন করে এখানে শিশুদের খেলাধুলার পার্কও করা হয়েছে। আর ঝরনার পাশেই আছে শ্রী শ্রী মাধবেশ্বর মহাদেবের মন্দির। প্রাচীন এ মন্দিরটি নতুনভাবে সংস্কার করা হয়েছে।

 

পাথারিয়া পাহাড় থেকে উৎসারিত এ ঝরনার উচ্চতা প্রয় ২০০ ফুট। বর্ষায় এর সৌন্দর্য্য বেশি উপভোগ্য। আগে ঝরনার পানিতে গোসল করা যেত। এখন নিষেধ রয়েছে। কারণ বেশ কয়েকজন দর্শনার্থী এ ঝরনার পানিতে গোসল করতে নেমে মারা গেছেন। তাই এখন কেবল ঝরনার পানি স্পর্শ করেই দর্শনার্থীরা তাদের মন জুড়ান। এছাড়া মাধবকুণ্ডের পাশেই আছে পরিকুণ্ড ঝরনা। এখন এ ঝরনার পথটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

 

ঝরনার পানি গড়িয়ে যে-মাধবছড়া দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, দর্শনার্থীরা এ ছড়ার পানিতেও নিজেদের ভেজান। নতুন করে এ ছড়ার বিভিন্ন স্থানে ইট-সিমেন্টের পশু-পাখির ভাস্কর্য বসানো হয়েছে। কিছুটা সময় ঝরনার সামনে থেকে ফিরে আসি পিঠার কাছে।

আমরা আসতে আসতে পিঠা পোড়ানো শেষ হয়েছে। বাঁশ থেকে পিঠা খোলা হয়। পেলাম এর স্বাদও। তারপর দুপুরের ভোজনপর্ব সারি নাজমুলের বাসায়, হাওরের কয়েক ধরনের মাছ দিয়ে। সত্যিই হাওরের মাছের আলাদা একটা স্বাদ আছে, যা পুকুর বা নদীর মাছে নেই।

 

সন্ধ্যার পর আজিমগঞ্জ বাজারে চা খেতে আসি। চায়ের পাশাপাশি খাই পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ মাখিয়ে কাঁচা ছোলা। এটা এখানকার হোটেলগুলোয় বিকেলের নাশতার আইটেম হিসেবে বিক্রি করা হয়। আবার সকালে যখন এলাম তখন দেখি, এসব হোটেলে পোলাও বিক্রি করা হচ্ছে রান্না করা ছোলা দিয়ে। সাধারণত আমরা মোরগ পোলাও বা ডিম পোলাও খাই, কিন্তু এখানকার মানুষ সকালের নাশতা হিসেবে বাজারের হোটেলে পোলাও খায় রান্না করা ছোলা দিয়ে। এর স্বাদও চেখে দেখি। স্বাদ মন্দ নয়! সত্যিই খাওয়া-পরায় একেক দেশের একেক রীতি-নীতি।

 

 

প্রয়োজনীয় তথ্য :

ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ থেকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্যামলী, রূপসী বাংলা, এনা বাস বড়লেখার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। থাকার জন্য বড়লেখা শহরে সাধারণ মানের হোটেল পাবেন। মাধবকুণ্ড ঝরনার কাছেও জেলা পরিষদের ডাকবাংলো আছে। খাওয়ার জন্যও বড়লেখা ও মাধবকুণ্ডে রেস্টুরেন্ট আছে।

 

 

ছবি : লেখক