শান্তিনিকেতনের দিনগুলি-১
লেখাঃ অলোক বসু
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩
ক.
রবীন্দ্র-সাহিত্যের নাট্যায়ন শীর্ষক কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য সাক্ষাৎকারের ডাক পড়ল। নির্দিষ্ট দিন নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে হাজির হলাম শিল্পকলা একাডেমিতে। সাক্ষাৎকার-কক্ষে ঢুকে দেখি বিশিষ্ট নাট্যজন আতাউর রহমান একা বসে আছেন। আতা ভাই যেমন গুণী নির্দেশক, তেমনি রবীন্দ্রবোদ্ধা। তাঁকে একা দেখে একটু ভড়কে গেলাম। এমনিতেই তাঁকে অনেক রাশভারী লাগে, আজ আবার তিনি একাই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার জন্য বসে আছেন। মনে মনে কু্ঁকড়ে যাচ্ছি। কী জানি কী প্রশ্ন করেন, আর কী উত্তর দিতে গিয়ে কোন বিপদে পড়ি। তিনিই সহজ করে দিলেন পরিবেশটা। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন—
-তুমিও যাবা নাকি?
ঢোক গিলে বললাম, সুযোগ পেলে…..।
-তুমি গিয়ে কী করবা?
আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কী জানতে চাইছেন তিনি। তার থেকেও সমস্যা হলো, এই প্রশ্নের কী উত্তর দিলে সন্তুষ্ট হবেন তিনি। আমি ঠিক কী উত্তর দেবো ভেবে পাচ্ছি না। এ রকম একটা সময়ে তিনিই আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন। বললেন,
- তুমি তো মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত নাট্যকার। তোমার লেখা বেশ কয়েকটি নাটক তো মঞ্চেও এসেছে। তুমি নতুন করে নাট্যরচনার কী শিখবা?
এর উত্তরে আমি কী বলব ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। তিনি মুচকি হেসে বললেন, পিকনিক করতে যেতে চাইছ?

এরপরে একথা সেকথা হলো দু-চার মিনিট। আমি ভাবছি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-নাটক প্রসঙ্গ কখন তুলবেন। মনে মনে ধরে নিয়েছিলাম, রবীন্দ্রনাথের নাটক, গল্প, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, উপন্যাস নিয়ে কিংবা রবীন্দ্ররচনা থেকে নাট্যরূপদান করার বিষয় নিয়ে জানতে চাইবেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের কোনো লেখা থেকে নাট্যরূপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে কিনা এসব জানতে চাইবেন। না, এ ধরনের কোনো আলাপই তিনি তুললেন না বরং ছেড়ে দিলেন আমাকে। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না একটু আগে সাক্ষাৎকারের নামে যে ঘটনটা ঘটল, সেটা আমার জন্য কী বার্তা বয়ে আনতে যাচ্ছে? সাধারণত সাক্ষাৎকার শেষে অন্য প্রার্থীরা কৌতুহল নিয়ে সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত জানতে চান। ঢোকার আগেও অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়, কিন্তু সেদিন সেই সময়ে সেখানে আর কোনো প্রার্থীরই দেখা পেলাম না। ফলে কারও সঙ্গে বিষয়টা শেয়ারও করতে পারলাম না। এমনকি জানতেও পারলাম না আর কারা কারা প্রার্থী ছিলেন। পুরোটাই আমার কাছে ধোঁয়াশে হয়ে রইল। অবশ্য ধোঁয়াশে ভাবটা কাটতে বেশি সময় লাগল না। দিন সাতেকের মধ্যে শ্রদ্ধাভাজন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার সাক্ষরিত একটি চিঠি এল আমার ঠিকানায়। সেই চিঠিতে জানতে পারি, কর্মশালার জন্য আমিও নির্বাচিত হয়েছি। বলে রাখা ভালো, উল্লিখিত কর্মশালার বাংলাদেশ অংশের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন রামেন্দু মজুমদার।
কয়েক দিনের মধ্যেই নির্বাচিত সকলের নামও জানতে পারলাম। শান্তিনিকেতনের সেই কর্মশালায় বাংলাদেশ থেকে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা হলেন মাহমুদুল ইসলাম সেলিম, আক্তারুজ্জামান, সাধনা আহমেদ, রুমা মোদক, মাহফুজা হিলালী, রাহুল আনন্দ, দীপক সুমন, শুভাশিস সিনহা, শামীম সাগর এবং আমি অলোক বসু। আমাদের মাঝে আক্তার তখন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতা, করিৎকর্মা মানুষ। আক্তার তার সাংগঠনিক দক্ষতাগুণে আমাদের পরিত্রাতা হয়ে উঠলেন। আমরা আমাদের প্রত্যেকের পাসপোর্ট আর দুই কপি ছবি তুলে দিলাম তার হাতে। তিনিই দৌড়ঝাঁপ করে ভিসা করিয়ে এনে দিয়েছিলেন আমাদের জন্য। এমনকি ভিসার যে ফি সেটাও তিনি পরে নিয়েছিলেন আমাদের কাছ থেকে। আক্তারের মতো গুণী সংগঠক পেয়ে আমরা মহাখুশি। তাকে আমরা অঘোষিত টিম-লিডার বানিয়ে ফেললাম। আক্তারও টিম-লিডার হিসেবে আমাদের যথেষ্ট দেখভাল করেছেন। আমাদের যেকোনো প্রয়োজনে আমরা তার শরণাপন্ন হতাম, আক্তারও আমাদের প্রয়োজনগুলো মেটাতে সচেষ্ট থাকতেন।
খ.
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হলো। আমাদের কাঙ্ক্ষিত দিন এসে গেল। ২০১১-র ১৬ জুন। বিকেল চারটায় আমাদের ফ্লাইট। তিনটার দিকে পৌঁছে গেলাম এয়ারপোর্টে। মনে দারুণ এক উত্তেজনা। অন্য সময়গুলোতে বিদেশ ভ্রমণকালে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে, নানা চিন্তা, অজানা আশঙ্কা মনের ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। এবার যেন তার লেশমাত্র নেই। একেবারে নির্ভার লাগছে। এর আগে এবং পরে বেশ কয়েকবার দলবেঁধে বিদেশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু সেবারের মতো আর কখনোই অতটা আনন্দের, অতটা রোমাঞ্চের, অতটা উত্তেজনার হয় নি।
এয়ারপোর্টে পৌঁছে দু-একজন সঙ্গীসাথী পেয়ে গেলাম। বাকিরাও একে একে চলে আসতে শুরু করে দিয়েছেন। সঙ্গীদের এক একজনকে দেখতে পাওয়ার পর আমরা উত্তেজনায় উদ্বেলিত হয়ে পড়ছিলাম। এয়ারপোর্টেই আমাদের এক আনন্দ-মিলনমেলা বসে গেল। এরই মাঝে দেখতে পেলাম সৈয়দ শামসুল হক এলেন স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক সহযোগে। ভাবলাম তাঁরা হয়তো লন্ডন যাচ্ছেন। কিন্তু না, তাঁরাও আমাদের দলে ভিড়ে গেলেন। একটু পরে মামুনুর রশীদও চলে এলেন আমাদের কাছে।
সৈয়দ শামসুল হক ও মামুনুর রশীদও যাচ্ছেন আমাদের সঙ্গে। তবে তাঁরা দুজন যাচ্ছেন কর্মশালার প্রশিক্ষক হিসেবে। আর আমরা যাচ্ছি প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে। জানতে পারলাম বাংলাদেশের অন্য আর একজন প্রশিক্ষক রামেন্দু মজুমদার তাঁর স্ত্রী ফেরদৌসী মজুমদারসহ দুদিন আগেই কলকাতা পৌঁছে গেছেন।

আমাদের মাঝে দীপক সুমন ছাড়া সকলেই চলে এসেছেন। কেউ কেউ টুকটাক কেনাকাটাও করছেন। মামুন ভাইকে দেখলাম ডিউটি-ফ্রি শপ থেকে তাঁর প্রিয় জিনিস কিনে নিয়ে এলেন। আক্তার বারবার ফোন করে দীপক সুমন কত দূরে আছেন তা জানার চেষ্টা করছেন। সুমন যে চারটার ফ্লাইট ধরতে পারবেন না, সেটা অনুমান করে বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখলেন আক্তার। সাড়ে চারটায় অন্য একটা ফ্লাইটে সুমনের যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তবেই যেন আক্তার হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। এদিকে আমরা সবাই আড্ডায় মশগুল। আড্ডা মূলত রাহুল আনন্দকে নিয়ে। ঠিক রাহুল আনন্দও আড্ডার বিষয় নয়, আড্ডার বিষয় হলো রাহুলের ট্রাউজার। বাংলায় যাকে আমরা পাজামা বলি। রাহুলের বৈচিত্র্যময় পোশাক দেখে হক ভাই কৌতুহলী হয়ে উঠলেন। তিনি নানাভাবে রাহুলের পাজামা, যা নেপালি পাজামার ঘেরকেও হার মানিয়ে দেয়—সেই পাজামা, ফতুয়া, মাথার টুপি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন গভীর মনোযোগের সঙ্গে। প্রয়োজনে হাত দিয়ে পরখ করেও দেখছিলেন হক ভাই। এ নিয়ে একটু দূরে থাকা আমাদের দু-তিনজনের মাঝে হালকা রসিকতাও হয়ে গেল একপ্রস্থ।
"এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর, /
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।" সৈয়দ শামসুল হকের এই কবিতার লাইনে রুমালের পরিবর্তে আমরা ‘পাজামার দড়ি’ শব্দ দুটি ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক প্যারোডি করে ফেলি। এতে কবিতার ছন্দ-মাত্রায় কিছুটা বিভ্রাট ঘটলেও আমাদের নির্মল-নির্দোষ আনন্দের ছন্দে কোনো বিঘ্ন ঘটে নি।
দীপক সুমনকে ছাড়াই আমরা যথাসময়ে হাওয়াই জাহাজে উঠে বসি। জানালা দিয়ে বাইরে মেঘের ঘনঘটা দেখে মনে হচ্ছিল রবিবাবু যেন আমাদের জন্য মেঘের খামে করে বর্ষাঞ্জলি পাঠিয়েছেন। ঢাকায় দেখে আসা হালকা মেঘের আনাগোনা আর মৃদুমন্দ হাওয়া পাল্টে গেল কলকাতায় এসে। অঝোর বরিষণ আর উতল হাওয়ার কারণে দমদম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিমানবন্দরে অবতরণে আমাদের খানিকটা দেরি হয়ে গেল। বিমান থেকে নেমেই দেখা হয়ে গেল দীপক সুমনের সঙ্গে। তিনি আমাদের আগেই পৌঁছে গেছেন। লক্ষ্য করলাম আমাদের জন্য প্রোটোকল দেওয়া হয়েছে। তার মানে আমরা ভিআইপি! জনা দুয়েক সরকারি কর্মকর্তা, একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও এক জিপ পুলিশ সমভিব্যাহারে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল শহর কলকাতার দিকে। বৃষ্টিতে স্নানরত মেঘমেদুর কলকাতার সৌন্দর্য আজ যেন অন্যরকম। লঘুচাপের দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টির যুগলবন্দী উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম সল্টলেকে। সেখানে একটি হোটেলে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা হয়েছিল আমাদের। তখনও সন্ধ্যা নামে নি। কিন্তু মেঘের ঘনঘটায় সন্ধ্যার আমেজ। বৃষ্টি একটু ধরে এলেও সহসা থামবার কোনো লক্ষণ নেই। বৃষ্টি না থামলেও আমাদের কোনও ক্ষতি নেই।
আগে থেকেই সব ঠিক করা ছিল। আমরা পৌঁছানোমাত্র আমাদেরকে হোটেলের ছিমছাম রেস্তোরাঁয় নিয়ে বসানো হলো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তারাঁয় বসে নানা রকম গরম গরম স্ন্যাকস ও কফি খেতে খেতে বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল জানালার বাইরে। সল্টলেক নতুন শহর। অভিজাত, ছিমছাম এলাকা। কলকাতার পরিচিত কোলাহল এখানে নেই। নির্জন রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে দু-একটা মারুতি কিংবা টাটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে রাস্তায় জমে থাকা জল ছিটিয়ে। নতুন শহর, নতুন পয়সাওয়ালাদের আবাসস্হল, ফলে পুরোনো দিনের অ্যাম্বাসেডর গাড়ি খুব কমই চোখে পড়ছে। অ্যাম্বাসেডর গাড়ি আর কলকাতা যেন একে অপরের পরিপূরক। আজকাল অবশ্য কলকাতার চেহারা অনেক পাল্টে গেছে। নতুন শহর তৈরি হয়েছে। আকাশচুম্বী চোখধাঁধানো নকশার দালানকোঠা হয়েছে, উড়ালসেতু উড়ে চলছে আর দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি ছুটে চলছে সাঁই সাঁই করে। আমার কিন্তু বুকের মাঝে সেই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কলকাতাই আসন গেড়ে বসে আছে।
কফি শেষ করে লাগেজ নিয়ে রুমে গেলাম। আমার আর সেলিমের জন্য দুই খাটের এক কক্ষ। রুমে গিয়ে অলস ভঙ্গিতে শুয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। হঠাৎ আমাদের মনে হলো কলকাতায় এসেছি, তার ওপরে উপরি পাওনা ঝড়বাদল; এমন সন্ধ্যা বৃথা যেতে দেওয়া যায় না। দুজনে বেরিয়ে হোটেলের নিচে নামলাম। পাশেই মানি এক্সচেঞ্জ এজেন্সি। কিন্তু সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কী হবে? আমাদের দুজনের কারো কাছেই কোনও ভারতীয় মুদ্রা নেই। তাহলে কি এমন বাদল দিনে জলহীনে তৃষ্ণায় মরতে হবে আমাদের?
হঠাৎ সেলিমের মাথায় বুদ্ধি এল—মামুন ভাইয়ের রুমে যাওয়া যেতে পারে। ভাগ্য ভালো হলে তৃষ্ণার ক্লান্তি কিছুটা দূর হলেও হতে পারে। দুজনে মামুন ভাইয়ের রুমে গেলাম। মামুন ভাইয়ের রুমে দীপক সুমনকেও পেয়ে গেলাম। মামুন ভাই বেশ আয়েশ করে একটা সিঙ্গেল সোফায় বসে আছেন। সামনে একটা সেন্টার-টেবিল। তার ওপরে একটা খালি কাঁচের গ্লাসও দেখতে পেলাম। পাশে একটা চেয়ারে সুবোধ বালকের মতো বসে আছে দীপক সুমন। আমাদের চোখ খু্ঁজে বেড়াচ্ছে কোনাকাঞ্চি। মামুন ভাই সম্ভবত আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য বুঝে গেছেন। তিনি আমাদেরকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করেন। আমরা উত্তর দিই আর ভাবি এরপরই হয়তো আমাদের প্রত্যাশিত বাক্য ‘খাবে নাকি একটু’ উচ্চারণ করবেন তিনি। কিন্তু না, তা আর করেন না মামুন ভাই। বরং আমাদের আশার অনলে জল ঢেলে দিয়ে বললেন, অলোক সেলিমকে নিয়ে এসেছো, চা খাও। আমরা এসেছি কীসের আশায়, আর উনি একি শোনান!
সেলিম আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে বলল, না মামুন ভাই চা খাব না, যাই।
সেলিম আমাকে টেনে দরজার বাইরে নিয়ে এসে বলল—
তুই মামুন ভাইয়ের সামনে খাস না?
বললাম, খাইতো। তার বাসায়ও খেয়েছি।
- তাইলে আমিই কুফা। আমি গেছি বলেই চা খেতে বললেন। সেলিমের জেদ আরও বেড়ে গেল। আমারও একই অবস্থা। এই বৃষ্টির রাত বিফলে যেতে দেওয়া যায় না। যে করেই হোক উপায় একটা খুঁজে বের করতেই হবে। আমরা আক্তারের রুম খুঁজে বের করলাম। কারণ ভারতীয় রুপি ওর কাছেই থাকতে পারে। আক্তারের কাছ থেকে পাঁচশ রুপি ধার নিলাম আমরা। আক্তার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন, রাত দশটার মধ্যেই কিন্তু ডিনার সারতে হবে। এরপরে কিন্তু খাবার পাওয়া যাবে না। তখন রাত প্রায় সাড়ে নটা বাজে।
আমরা দুজনে চলে গেলাম হোটেলের বারে। নির্জন বার। ভিতরে যুবা বয়সী একজন লোক। কোনো খদ্দের না থাকায় সবকিছু বন্ধ করে বেরিয়ে পড়ার পাঁয়তারা করছিলেন তিনি। আমাদের দেখে একটু বিরক্তই হলেন বোধহয়। বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে বিরক্তিভাব চেপে গেলেন। পরে জানা গেল তিনি অনেক দূরে থাকেন, বৃষ্টিবাদলের রাতে বাড়ি ফিরতে সমস্যা হয়। খদ্দের নেই বলে তিনি একটু তাড়াতাড়িই বেরুতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা আর হলো না আমাদের কারণে। বাংলাদেশ নিয়ে তার আবার দারুণ আগ্রহ। বাংলাদেশের সাহিত্যও তিনি মাঝে মাঝে পড়েন। হুমায়ূন আহমেদ পড়েছেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়েছেন, শওকত আলী পড়েছেন। সার্ভ করার সময়ে তার সঙ্গে গল্প চলল।
যুবকটিকে আমাদের বেশ ভালো লেগে গেল। আমাদেরকেও হয়তো তার ভালো লেগে থাকবে। সে-রাতে তিনি আমাদের একবাটি বাদামমাখা খাইয়েছিলেন বিনে পয়সায়। তাছাড়া আমাদের কাছে যে-টাকা ছিল, তাতে সাড়ে তিনটা বিয়ারের দাম হয়। তিনি আমাদের চারটা বিয়ার দিয়েছিলেন সেই পাঁচশ টাকায়। তার মানে অর্ধেকটা বিয়ারের দামও তিনি মওকুফ করে দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা হয়েছিল সেই রাতে। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ—নানা বিষয়ে তার আগ্রহ। বারে কাজ করেন, অথচ তার পড়াশুনার বহর দেখে আমরা বিস্মিত। আহা কী মায়াময় এক দেবদূত যুবকের সঙ্গে পরিচয় মাত্র দেড় দু-ঘণ্টার জন্য। সারা জীবনেও তার কথা ভুলতে পারব না। তার নামটা অবশ্য এই মুহূর্তে আর মনে করতে পারছি না। সেজন্য লজ্জাও হচ্ছে।
ওখান থেকে বেরুতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। এরপর আমি আর সেলিম চুপিচুপি রেস্তোরাঁয় গেলাম। সেখানেও যদি কোনো মায়াময় দেবদূতের দেখা পাই, যে আমাদের দুজনের খাবার নিয়ে বসে আছে। সৌভাগ্য বারবার আসে না। গিয়ে দেখি রেস্তোরাঁর ভেতরে অন্ধকার, বাইরে থেকে তালা দেওয়া। আমরাও পেটে তালা দিয়ে রুমে এসে শুয়ে পড়লাম।
গ.
বৃষ্টি কিছুতেই আমাদের পিছু ছাড়ছিল না। পরদিন বৃষ্টির ভিতরেই শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম আমরা সদলবলে। বৃষ্টির কারণেই হয়তো-বা যাত্রী কম। ট্রেনের কামরার ভেতরে কোথাও কোথাও জলও জমে গিয়েছিল। তাতে আমাদের খুব একটা অসুবিধা হয় নি। হৈ-হুল্লোড় করে বেশ আনন্দেই সময় কেটে যাচ্ছিল। শান্তিনিকেতনগামী ট্রেনে কখনই বাউলের অনুপস্থিতি লক্ষ করি নি, সেদিনও তার ব্যত্যয় হয় নি। বর্ষণমুখর দিনে বাউলের গান শুনতে শুনতে, আর বাইরের সবুজ প্রকৃতি আর বৃষ্টি দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম বোলপুরে।
আমাদের কর্মশালা ও থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল বসুন্ধরা নামের একটি আবাসিক হোটেলে। শান্তিনিকেতন-ক্যাম্পাসের অদূরেই। সেখানে পৌঁছনোমাত্র ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমাদের বরণ করে নেওয়া হয়েছিল। হোটেলের ভবনটি ছিল দ্বিতল। মাঝখানের অঙ্গনে নানা রকম ফুলের গাছ। বাগানের চারদিক ঘিরে আয়তাকার বিন্যাসের ইমারত। আমাদের আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রশিক্ষণার্থী ও প্রশিক্ষকবৃন্দ। ঐ দিন সন্ধ্যায় একটি পরিচিতিসভা হয়। আমাদের দশ দিনের সেই আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মোট বিশ জন প্রশিক্ষণার্থী এবং আট জন সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষক। এই আট জন হলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মনোজ মিত্র, সৈয়দ শামসুল হক, বিভাস চক্রবর্তী, রামেন্দু মজুমদার, অরুণ মুখোপাধ্যায়, মামুনুর রশীদ, চন্দন সেন ও দেবাশীষ মজুমদার। প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন মনোজ মিত্র। এঁরা প্রতেক্যেই আমাদের নাটকের অঙ্গনে এক একজন দিকপাল। এঁদের সার্বক্ষণিক সাহচর্যে এবং পরামর্শে কেটেছে কর্মশালার দশ দিন, এবং আগে-পরের দুদিনসহ মোট বারো দিন। এঁদের ক্লাস, বক্তব্য, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমরা ঋদ্ধ হয়েছি প্রতিমুহূর্তে।

এঁরা ছাড়াও এই বারো দিন আমরা সান্নিধ্য পেয়েছি বিশিষ্ট অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার এবং সুসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের। তাঁরা নির্ধারিত প্রশিক্ষক না হলেও বিভিন্ন ক্লাসে তাঁদের সরব উপস্থিতি, অভিজ্ঞতা, দর্শন ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁদের চিন্তাভাবনা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের। এছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যায় একজন করে অতিথি প্রশিক্ষক এসে যুক্ত হতেন আমাদের সঙ্গে। বিশ্বভারতীর অভিজ্ঞ ও বর্ষিয়ান অধ্যাপকবৃন্দ যেমন আসতেন, তেমনি কলকাতা থেকেও রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞগণ আসতেন। তাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীত-গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ-চিত্রকলা-দর্শনসহ যাবতীয় বিষয়ে তাঁদের জ্ঞানের ভাণ্ডার উজাড় করে খুলে দিতেন আমাদের সামনে। সেইসব অধ্যাপক ও রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞদের সবার নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে শাঁওলী মিত্র, ব্রাত্য বসু এঁদের কথা খুব মনে আছে। শাঁওলী মিত্রের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। ব্রাত্য বসুও তুখোড় নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা; সেইসঙ্গে তুখোড় রাজনীতিবিদও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সদ্যগঠিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন জাঁদরেল মন্ত্রীও তখন তিনি। এবং এই কর্মশালা উদ্যোগের অন্যতম নেপথ্যের কারিগরও সম্ভবত তিনি।
পরিচিতি সভার দিনই আমাদের সকলকে একটি শিডিউল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাতে প্রতিদিনের কর্মশালার সময়সূচি দেখে আমাদের কারো কারো চোখ চড়কগাছ। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ছটায় ক্লাস শুরু হয়ে রাত আটটা পর্যন্ত চলার কথা। রাত আটটায় অবশ্য কোনোদিনই ক্লাস বা বৈঠক শেষ হয় নি। এর কারণ হলো সান্ধ্য অধিবেশনে খ্যাতনামা পণ্ডিত ও শিল্পীরা আসতেন অতিথি হয়ে। তাঁদের কেউ-বা রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কথা বলতেন, তারপর গান শোনাতেন। কেউ-বা রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম নিয়ে কথা বলতেন। আবার স্লাইড শো-এর মাধ্যমে চিত্রকর্মগুলো প্রদর্শন করতেন। ফলে এই আকর্ষণীয় সান্ধ্য অধিবেশনটি রাত নটা সাড়ে নটা অবধি চলত। কর্মশালার রুটিনটি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও দীর্ঘ। সারা দিনে অবসর বলতে তেমন কিছু ছিল না।
সকালে সাড়ে আটটায় জলখাবারের জন্য আধা ঘণ্টার বিরতি; দুপুরে একটা থেকে তিনটা পর্যন্ত স্নান; মধ্যাহ্নভোজন ও বিশ্রামের বিরতি; বিকেল পাঁচটায় আধা ঘণ্টার চা-জলপানের বিরতি ছাড়া পুরো সময়টায়ই ক্লাস। সকাল ও বিকালে আরও দুটি চা-বিস্কুটের বিরতি অবশ্য মিলত দশ মিনিট করে।
আমাদের আনুষ্ঠানিক ক্লাস শুরু হয়েছিল ১৮ জুন। বেশ উত্তেজনা নিয়ে ঘুম থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে সকাল সাড়ে ছটায় গিয়ে প্রথম ক্লাসে হাজির হলাম। আমাদের প্রধান প্রশিক্ষক জানিয়ে দিলেন এভাবে ঘুম ঘুম চোখে ক্লাসে আসা যাবে না। আরও সকালে ঘুম থেকে জেগে ন্যূনতম আধা ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ঘোরাঘুরি করে এসে এই বৈঠকে উপস্থিত হতে হবে। কারণ এই বৈঠকটি মানস্তাত্ত্বিকভাবে খুব জরুরি। দিনের শুরুতে প্রকৃতির সান্নিধ্য মনের মাঝে যে-অভিঘাত সৃষ্টি করে তারই সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণাত্মক বৈঠক এটি। প্রথম দিন প্রথম ক্লাসেই মনে হলো এ কোথায় এসে পড়লাম! প্রাচীন টোলের শিক্ষা পদ্ধতিতে নয়তো? আর শ্রদ্ধাভাজন নাট্যশিক্ষক, নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা মনোজ মিত্রকে মনে হতে থাকল হেড পণ্ডিত। আমরা অনেকেই আড়ালে আবডালে তাঁকে হেড পণ্ডিত বা হেড মাস্টারমশাই হিসেবে সম্বোধন করতাম।
অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটিয়ে এই বৈঠকে যোগ দিতে প্রথম দিকে খুব কষ্ট হলেও পরে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। এটা ছিল এক ধরনের মনোসংযোগ ঘটানোর ক্লাস। শিক্ষকসহ আমরা প্রত্যেকে দিনের শুরুর অনুভূতির কথা বলতে পারতাম এই বৈঠকে। কখনো কখনো কবিতা আবৃত্তি, পাঠ কিংবা গান করারও সুযোগ পেতাম। একদিন আমি স্মৃতি থেকে রবীন্দ্রনাথের "আফ্রিকা" কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলাম। আবৃত্তি শেষে মামুনভাই ধরিয়ে দিলেন আমি কোন চারটি লাইন ভুলে বাদ দিয়ে আবৃত্তি করেছি। আমি বিস্মিত মামুন ভাইয়ের স্মরণশক্তি দেখে। রবীন্দ্রনাথের প্রচুর কবিতা তাঁর মুখস্থ। তাঁর স্মৃতিশক্তি সত্যিই বিস্ময় জাগানিয়া। এই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী সকলেই মনের অনুভব প্রকাশ করতে গিয়ে এক একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতেন সকলের সামনে।
ওহো... প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণকারী সকলের নাম একসঙ্গে বলতে ভুলে গেছি। বাংলাদেশ থেকে ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম সেলিম, অলোক বসু, আক্তারুজ্জামান, সাধনা আহমেদ, রুমা মোদক, মাহফুজা হিলালী, রাহুল আনন্দ, দীপক সুমন, শুভাশিস সিনহা ও শামীম সাগর। আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে ছিলেন সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভাশিস খামারু, পূর্বাচল দাশগুপ্ত দাদা, দুলাল দাদা, মৃণাল, সুব্রত দাদা, শর্মিলা দিদি, অন্বয়, সঙ্ঘমিত্রা, ত্রিদিব দাদা (পলাশদা) ও স্নেহাশিস।
প্রথম দিনই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য গাইড প্রশিক্ষক বা মেন্টর নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। আমার এবং পশ্চিমবঙ্গে শুভাশিস খামারু—এই দুজনের গাইড ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। বাকি ১৮ জনেরও দুই কিংবা তিন জনের করে গ্রুপে গাইড ছিলেন বাকি সাত জন প্রশিক্ষক। দুপুরের পরের সেশনে আমাদের কাজ ছিল যার যার গাইডের সঙ্গে পরামর্শ, ক্লাস বা আলোচনা। প্রথম দিন দুপুরের পরের সেশনে চন্দন সেন দাদার তত্ত্বাবধানে থাকা আমাদের প্রশিক্ষণার্থী বন্ধুরা অতি আগ্রহে দাদার অনুমতি নিয়ে শান্তিনিকেতন ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিলেন। এটা জানতে পেরে মনোজ মিত্র দাদা বেশ রুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি কোনোমতেই চাইতেন না শৃঙ্খলার কোনো ব্যত্যয় ঘটুক। ফলে আমরাও সতর্ক হয়ে গেলাম। আর প্রশিক্ষকবৃন্দও কোনোরকম ছাড় না দিয়ে আরও গভীর মনোযোগ সহকারে তাঁদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হলেন। যাঁরা আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন, তাঁরা সকলেই তাঁদের মেধা উজাড় করে দিয়ে আমাদের কিছুটা শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের আন্তরিক শিক্ষাদান প্রচেষ্টা সত্যি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ঘ.
১৭ জুন বিকেলের পরিচিতি সভা শেষে আমরা যে যার কক্ষে ফিরে আসি। রাতে খাওয়ার পরে আড্ডা দিতে দিতে সম্ভবত সাধনা আহমেদই আমাদের দশজনকে একত্রিত করে জানাল, আগামীকাল ১৮ জুন ফেরদৌসী আপার জন্মদিন। সিদ্ধান্ত হলো রাত ১২:০১-এ ১৮ জুনের প্রথম প্রহরে আমরা দশ জনে মিলে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাব। অত রাতে কোনো উপহার, এমনকি ফুল সংগ্রহ করাও দুঃসাধ্য। আমরা হোটেলের বাগান থেকেই দু-চারটা ফুল সংগ্রহ করে রাত বারোটায় রামেন্দু দাদাদের রুমে নক করলাম। রামেন্দুদা এবং ফেরদৌসী আপা দুজনেই আমাদেরকে দেখে বিস্মিত। সম্ভবত তাঁরাও আশা করেন নি বিদেশ-বিভুঁইয়ে গভীর রাতে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে তাঁদের হোটেলকক্ষে কেউ হানা দেবে। অপ্রত্যাশিত আনন্দে তাঁরা উভয়েই খুশি হলেন। এতজনকে বসতে দেওয়ার মতো জায়গাও নেই কক্ষে। আমরা কেউ মেঝেতে, কেউ বিছানায় বসে আড্ডা দিলাম। আধা ঘণ্টার আড্ডা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের সেই ক্ষণটি ছিল অসাধারণ। সেদিন রামেন্দুদা শুভেচ্ছা জানানোর আগেই আমরা শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম ফেরদৌসী আপাকে। নিরাভরণ হলেও আন্তরিকতায় পূর্ণ সেই জন্মদিনের কথা ফেরদৌসী আপার মনে আছে কিনা জানি না। তবে আমরা কাছে থেকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাতে পেরে পুলকিত বোধ করেছিলাম।

তখন অবশ্য আমাদের সবকিছুতেই পুলক। ফেরদৌসী আপার জন্মদিন পালনের আগে সন্ধ্যারাতে ঘটে গেছে একপ্রস্থ মজার ঘটনা। সেই ঘটনাটা বর্ণনা দেওয়ার আগে আমাদের সকলের কক্ষবিন্যাস সম্পর্কে একটু ধারণা দিতে চাই। তাতে দশ দিনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা সম্পর্কে বুঝতে সুবিধা হবে।
আয়োজকরা আমাদের থাকার জন্য কক্ষ বিন্যাসেও যথেষ্ঠ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছিলেন। সিঁড়ির গোড়ায় নিচতলায় পশ্চিম দিকের সারির প্রথম কক্ষটি বরাদ্দ ছিল রামেন্দু মজুমদার-ফেরদৌসী মজুমদারের জন্য। তারপরের কক্ষটি সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হকের জন্য।
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলে প্রথম কক্ষটি আমার আর সেলিমের, এরপরের কক্ষটি রাহুল আনন্দ ও দীপক সুমনের, তারপরের কক্ষটি শামীম সাগর ও শুভাশিস সিনহার জন্য বরাদ্দ। দোতলার দক্ষিণ সারির কক্ষগুলোর বড় একটা কক্ষে সম্ভবত একসঙ্গে থাকতেন সাধনা আহমেদ, রুমা মোদক ও মাহফুজা হিলালী। তাদের অদূরে পূর্ব দিকের সারির একেবারে দক্ষিণ দিকের একটা ঘর বরাদ্দ হয়েছিল আক্তারের জন্য। আক্তারের ঘর থেকে ২/৩ ঘর পরেই বরাদ্দ ছিল মামুন ভাইয়ের ঘর। মামুন ভাইয়ের কাছাকাছি ঘরগুলো বরাদ্দ ছিল বিভাসদা, অরুণদা, দেবাশীষদা, চন্দনদা এবং মনোজ দাদাদের জন্য। মামুন ভাইয়ের উল্টো দিক বরাবর বাগান পেরিয়ে রাহুল আর সুমনের ঘর। ওদের ঘরের নিচে হক ভাইয়ের ঘর। অবস্থানগত কারণে এই ঘরটির যেমন বিশেষত্ব রয়েছে, তেমনি ওদের দুজনের বিশেষত্বের কারণেও ওদের ঘরটি আমাদের জন্য হয়ে উঠেছিল বিশেষ আকর্ষণের। আর নিচতলার বাকি ঘরগুলো বরাদ্দ ছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য।
প্রথম সন্ধ্যায় পরিচিতি পর্ব চুকিয়ে এসে আমরা যে যার ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ আমাদের পাশের ঘর থেকে চাপা হাসির শব্দ আসতে থাকে। আমি আর সেলিম ছুটে যাই পাশের রাহুল আর সুমনের ঘরে। গিয়ে দেখি ওখানে শামীম সাগর আর শুভাশিস সিনহাও হাজির। শুভাশিস স্বভাবগতভাবে মিটি মিটি হাসছে আর বাকি তিন জন হেসে কুটিকুট। প্রত্যেকেই যার যার মুখে হাতচাপা দিয়ে রেখেছে বলে হাসির শব্দ বেশি দূর পৌঁছায় নি। পাশের রুম থেকে আমরা হালকা টের পেয়ে ছুটে এসেছি। তখনও বুঝতে পারি নি হাসির কারণ কী। কেউ একজন বলে উঠল, কাজ হয়ে গেছে। কী কাজ হয়ে গেল, আমরা জানলাম না। আমি আর সেলিম চেপে ধরলাম ওদেরকে।
আস্তে আস্তে ওরা রহস্যভেদ করল। ওদের মধ্যে কেউ একজন, নামটা উল্লেখ নাই করলাম, কলকাতার একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের এক প্রশিক্ষণার্থী বন্ধুর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে ঘণ্টাখানেক সময় ধরে। সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে যখন ছবি তোলার প্রসঙ্গ এল, তখন সাংবাদিক সাহেব সাক্ষাৎকারদাতাকে পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে বোলপুর স্টেশনে যেতে অনুরোধ করলেন। সেখানেই একজন ফটোসাংবাদিক গিয়ে তার ছবি তুলবেন। ছবি ছাড়া আবার ইন্টারভিউটা ছাপা হবে না। আর ছবিটা আগামীকালই হাতে পেতে হবে। এই প্রস্তাবে সাক্ষাৎকারদাতা উশখুশ করছিলেন, কারণ পরদিন সেই সময়ে তার ক্লাস আছে। সাক্ষাৎকারদাতার উশখুশানি দেখে সাংবাদিক সাহেব ‘আচ্ছা দেখি কী করা যায়’ বলে ফোন কেটে দিলেন। এই ফোন কাটার পর থেকে শুরু হয়েছে হাসি। যিনি ইন্টারভিউ নিয়েছেন তিনিও হাসছেন, আর যারা পাশে থেকে এক ঘণ্টার এই ইন্টারভিউ নামের তামাশা নাটক দেখেছেন, তারাও হাসছেন। ওদের হাসি দেখে সেলিম আর আমিও ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো হাসতে শুরু করি।
হাসি থামার পর সবার মনে হলো খেলাটা মন্দ নয়। প্ল্যান চলল নতুন কাকে ইন্টারভিউর বড়শিতে গাঁথা যায়। অনেক আলোচনার পর আমাদের বাংলাদেশের নারী প্রশিক্ষণার্থী বন্ধুদের একজনকে ঠিক করা হলো। বিবেচনায় রাখা হলো ইন্টারভিউ পর্বটি যাতে উপভোগ্য হয়। আমাদের একজন টেলিফোন অপারেটর সেজে ইন্টারকমে ফোন দিলেন। ফোন দিয়ে তিনি চেয়ে নিলেন কাঙ্ক্ষিত ইন্টারভিউদাতাকে। তারপর বানিয়ে বানিয়ে কলকাতার একটি পত্রিকার নাম বলে বললেন, সেখানকার সিনিয়র রিপোর্টার অমুক আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান, আপনি রাজি থাকলে লাইনটায় সংযোগ দিয়ে দিই। বলতে না বলতেই ইন্টারভিউদাতা রাজি হয়ে গেলেন। আর এতক্ষণ যিনি অপারেটরের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি সরাসরি ফোনটা সাংবাদিক মহোদয়ের হাতে তুলে দিয়ে মুখ চেপে হাসতে শুরু করলেন। ফোন স্পিকারে দিয়ে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হচ্ছিল। ফলে ইন্টারভিউদাতা ও গ্রহীতার সব কথাই শুনতে পাচ্ছিলাম আমরা।
ইন্টারভিউগ্রহীতা বড় ঝানু সাংবাদিক। তিনি মোটামুটি বাংলাদেশের থিয়েটার নিয়ে সবই জানেন। আর ইন্টারভিউদাতাও সব উত্তর দিয়ে চলছেন। মফস্বল শহরে থিয়েটার করার ক্ষেত্রে কর কী প্রতিবন্ধকতা, একজন নারী নাট্যকারকে কোন কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়—এসব তিনি গড়গড় করে বলে যাচ্ছিলেন। খুব ভালোই ইন্টারভিউ চলছিল, পাশ থেকে আমরা মাঝেমাঝে নিজেদের মধ্যে এমন কিছু কিছু কথা বলছিলাম যাতে ওপাশের ইন্টারভিউদাতা সহজেই অনুমান করতে পারেন পত্রিকা অফিসের আবহটি। ইন্টারভিউদাতা মাঝে মাঝে দুঃখ প্রকাশ করছিলেন কারণ তার রুম থেকে শব্দ হওয়ায়। এটাই স্বাভাবিক কারণ রুমমেট দুজন তো আর জানেন না যে, তিনি কলকাতার বিখ্যাত দৈনিকের সিনিয়র রিপোর্টার অমুককে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। সাক্ষাৎকার বেশ জমে উঠেছে। আমরা মুখ চেপে চেপে হাসছি। আগের সাক্ষাৎকারের মতো অতটা দীর্ঘ সময় চলার সুযোগ হয় নি এই সাক্ষাৎকারটির। এরই মাঝে পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল ছবি তোলার কী হবে? ইনিও কি বোলপুর স্টেশনে আসবেন? সঙ্গে সঙ্গে এদিক থেকে অট্টহাসির রোল উঠল। সাংবাদিক মহোদয়ও হাসি আটকাতে পারলেন না। এতক্ষণ যে মজার তামাশা চলেছে ইন্টারভিউদাতা যাতে সে ব্যাপারটা বুঝতে না পারেন সেজন্য আমাদের দিক থেকে ইন্টারকমের লাইনটা কেটে দেওয়া হলো। লাইন কাটার পর সে কী হাসি আমাদের, যেন বিশাল বিজয় অর্জিত হয়েছে!

রাতের খাবারের সময়ে সবার সঙ্গে সবার দেখা হলো। সাক্ষাৎকারদাতা দুজনকেই কিছুটা উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। আবার সেই উৎফুল্লতার মাঝে কেমন জানি নিজেকে চেপে রাখার একটা কসরৎও লক্ষ করা যাচ্ছিল তাদের চেহারায়। পরে অবশ্য খাওয়ার শেষ দিকে কায়দা করে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে। অনেক গল্প গুজবের পর খুব কায়দা করে রহস্যটা ভেদ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে আবার কেউ ছবি তোলার জন্য পরদিন বোলপুর স্টেশনে না চলে যান। বলে রাখা ভালো, কাউকে খাটো করা বা পঁচানোর কোনো অভিপ্রায় ছিল না এই সাক্ষাৎকার-নাটক মঞ্চায়নের পিছনে। বরং যা ছিল, তা হলো তাৎক্ষণিকভাবে নির্মল আনন্দলাভ। বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠ হলেই বোধ করি এমনটা সম্ভব।
[এ-ভ্রমণকাহিনী লেখকের ‘কানাকড়ির মঞ্চজীবন’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত]