রামুর গহীন জঙ্গলে

লেখাঃ মামুনুর রশীদ দিপু

শুক্রবার, ৩রা মার্চ, ২০২৩

কক্সবাজারের ‘রামু রাবার বাগান’ অনেকই পুরনো। এ-বাগানেরই অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে আব্বার প্রথম চাকরিটা হয় আজ থেকে বছর পঞ্চাশেক আগে। তার আগে পাহাড়-জঙ্গল দূরের কথা, আমার মা জীবনে কোনও দিন চট্টগ্রামই যান নি। অথচ সেই তাকেই কিনা বিয়ের কিছুদিন পর নিজের বাড়ি ছেড়ে এক ধাক্কায় আটশ' কিলোমিটার দূরের ওই পাহাড়ি জঙ্গলে গিয়ে সংসার শুরু করতে হয়েছিল। আমার বড় বোনের তখন সবেমাত্র এক বছর বয়স। ছোট্ট মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে মা তার স্বামীর হাত ধরে গিয়ে উঠল রামুর গহীন জঙ্গলের এক রেস্টহাউজে। ওদিকটায় লোকজনের বসবাস এখনও খুব একটা দেখা যায় না। আর তখন তো আরও কম ছিল। আম্মা রামুতে যাওয়ার ঠিক দশ মাস পর আমার জন্ম হলো।

রামুর গহীন জঙ্গলে

আম্মা যথেষ্টই সাহসী। রাবার-বাগানে আমাদের বাসাটার আশেপাশে আর কোনও বাড়িঘর ছিল না। শুধু সারি সারি রাবার গাছ, অল্প দূরের চা-বাগান আর চারদিকে ঘন বন। পাহাড়ি জঙ্গলের এক ধরনের গা ছমছমে ঝিমধরা সৌন্দর্য আছে। বেড়াতে গেলে সে সৌন্দর্য যতটা অনুভব করা যায়, দীর্ঘদিন থাকার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে গেলে, কতটা ভালো লাগা আর কতটা ভয় কাজ করে সে অভিজ্ঞতা আমার নেই।

 

আব্বা অফিসে চলে গেলে আম্মাকে ছোট বাচ্চা নিয়ে একাই থাকতে হতো। দিনের বেলায় সেখানে বানর এসে প্রচুর উৎপাত করত। প্রায় রাতেই হরিণের দেখা মিলত। ওই আমলে ওদিকটায় বাঘ বা বড় বেড়াল জাতীয় প্রাণী ছিল কি না তা আম্মা বলতে পারল না। তবে হাতি, হরিণ, বড় অজগর, কেউটে, হনুমান, দাঁড়াশ সাপ, বাদামি খরগোশ এসব হরহামেশাই দেখতে পাওয়া যেত।

রামুর গহীন জঙ্গলে

চাকরি হওয়ার পর প্রথম এক বছর আব্বা রামুতে একাই থাকতেন। আতিক নামে এক পিওন ওনাকে রান্না করে খাওয়াত। যেকোনো চা কিংবা রাবার-বাগানের জন্য ট্রাক্টর খুব জরুরি একটা যান। মোখলেছুর নামে একজন ট্রাক্টর-ড্রাইভার আব্বার খুব ভক্ত ছিল। এই মোখলেছুর না থাকলে সেদিন আমার নানাকে তার সহজ-সরল কন্যা, অর্থাৎ আমার মা, আর নাতনিকে নিয়ে কী বিপদেই না পড়তে হতো! নড়াইল থেকে রওনা দিয়ে প্রথমবার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জামাই’র বাসায় পৌঁছে দিতে আসা। পথঘাট জানা নেই। বাস থেকে ভুল করে নামিয়ে দিল বেশ খানিকটাই দূরের একটা জায়গায়। দুপাশে ঘন জঙ্গল, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এরকম অবস্থায় ট্রাক্টর চালিয়ে মোখলেছুর ওই পথ দিয়েই বাগানে ফিরছিল। ওদের ওই অবস্থায় দেখে গন্তব্য-পরিচয় জানতে পেরে সে অতি আহ্লাদিত হয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিল। ট্রাক্টরে চড়ার অভিজ্ঞতা থাকলে বুঝতেন, ওতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি হয়!

 

হোক ঝাঁকুনি, তাও ভালো। নইলে সেদিন সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হতো। আর কতক্ষণ যে ওদের জঙ্গলের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হতো কে জানে! পরে নাকি বাড়িতে ফিরে গিয়ে নানা আফসোস করে একদিন বলছিলেন, "আমার মেয়েটারে বনবাসে রাইখে আসলাম!"

রামুর গহীন জঙ্গলে

যাইহোক, আমার এ-লেখার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু যতোটা না শৈশবের স্মৃতিচারণ, তার চেয়ে বেশি অন্য কিছু। এটিকে আবার ঠিক ভ্রমণকাহিনিও বলা যাবে না। কারণ ভ্রমণটা এখনও ফিউচার টেন্সেই ঘুরপাক খাচ্ছে। দিন-তারিখ, হোটেল-রেস্টহাউজ বুকিংসহ প্রায় সকল প্রস্তুতিই সম্পন্ন। এখন শুধু রওনা দেবার প্রতীক্ষা। অপেক্ষা আর প্রতীক্ষার ভেতর বেশ বড় রকমের একটা পার্থক্য আছে। প্রতীক্ষা, অপেক্ষার চাইতেও অনেক বেশি কিছু—কারণ এর সঙ্গে আবেগ, ভালোলাগা, রোমাঞ্চ, এমনকি কিঞ্চিৎ উৎকন্ঠাও মিশ্রিত। সে দৃষ্টিকোণ থেকে দলের অন্যদের তুলনায় আমার কাছে এ-সফরটা একটু অন্যরকম। নস্টালজিয়া ফ্যাক্টর!

 

পর্ব-২

রামুর গহীন জঙ্গলে, পূর্নিমার রাতে

 

আমাদের মূল পরিকল্পনা ছিল আগে কক্সবাজার ঘুরে এসে তারপর রামুতে একদিন-একরাত থাকার। সে-অনুযায়ীই সব চলছিল। তবে আপাতত এ-লেখায় কক্সবাজারের অংশটুকু বাদ দিচ্ছি। পাঠকদের সরাসরি রামুতেই নিয়ে যাই। কারণ রামুকে ঘিরে একদমই অন্যরকম একটা গল্প আছে। গল্পটা তীব্র ভয় এবং আতঙ্কের। এই নিয়ে দুই জনের লেখাও আছে। কখনও সুযোগ হলে শেয়ার করার বাসনা রইল। আর গল্পটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দায় পাঠকের ওপরই থাকল।

 

আজ থেকে ২২ বছর আগে ঘটা অলৌকিক সেই ঘটনার ভিকটিম এবং সাক্ষী এ-দলের বেশ কয়েকজন। রামু রাবার-বাগানের রেস্টহাউজে ঘটা সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা অনেক শুনেছি ওদের মুখ থেকে, মুন্নীর কাছে তো বহুবার।

 

কক্সবাজার পর্যন্ত আমাদের দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ষোলো। রামুতে যাবার দিন অর্থাৎ ২২ তারিখ সকালে ঢাকা থেকে আরো দুজন এসে যুক্ত হলো। দুজন ড্রাইভারসহ আমরা মোট কুড়ি জন। দুটো গাড়ি। একটা বড় মাইক্রোবাস, আরেকটা জীপ।

 

কক্সবাজার থেকে রামুর দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছি আর ভাবছি— “যাক আজকের দিনটা অন্তত নিজেদের মতো করে কাটানো যাবে। এ-কয়দিন তো মামুন ভাই আর তার স্ত্রীর মাত্রাতিরিক্ত আপ্যায়ন-আতিথেয়তায় সবাই অস্থির।” আদর যখন অতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন তাকে অত্যাচার ছাড়া আর কিইবা বলা যায়! এ-কয়দিন কোনো কিছুই আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতো করতে পারি নি। প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচি ছিল। আর তার সবগুলোই জমকালো। হয় ডি.সি. অফিসের অফিসারদের সঙ্গে ডিনার নয়তো লাঞ্চ, অথবা সমুদ্রতীরে বসে সান্ধ্যকালীন সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়াভাজির আয়োজন।

 

আমরা আসলে এসবের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। জানতাম যে মামুন ভাই যেহেতু কবীরের বন্ধু, আর পদাধিকার বলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, তিনি হয়তো আমাদের জন্য বিশেষ কিছু করারই চেষ্টা করবেন। এটুকুই। কিন্তু তার পরিসর শেষ পর্যন্ত গিয়ে যা দাঁড়াল তাকে এক কথায় এলাহী কাণ্ডকারখানা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। তবে এ-নিয়ে অন্য কোনো সময়ে লেখা যাবে। এখন আমরা যাচ্ছি রামু।

 

সমতল ছেড়ে পাহাড়ি অঞ্চলের শুরুর দিকেই রাবার-বাগানের সীমানা আরম্ভ হয়েছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণে রামুর স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। চলার পথে এক জায়গায় ‘বন্য হাতি চলাচলের স্থান’ লেখা সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম। মনের মধ্যে কিছু একটা ঘটে চলেছে। প্রায় সবারই। এই সেই রামু রাবার-বাগান। যেখানে আমার জন্ম। ফলে আমার তো আলাদা একটা আকর্ষণ কাজ করবেই। আর বাকিদের আকর্ষণের কারণ বাইশ বছর আগে ঘটা সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি রোমন্থন অথবা এ-কদিনের জমকালো আনুষ্ঠানিকতা ছেড়ে পাহাড়ের নীল নির্জনে রাত কাটানোর রোমাঞ্চ। বিশেষ করে বাচ্চারা দারুণ এক্সাইটেড। তারা আগেই বলে রেখেছে রামুতে গিয়ে মায়েদের মুখ থেকে সেই ভূত দেখার গল্প শুনবে!

 

কিন্তু রেস্টহাউজে পৌঁছে দেখি বিশাল প্যান্ডেল টানানো, স্টেজ, ব্যানার, একটার পর একটা গাড়ি আসছে, বিভিন্ন ধরনের লোকজনের আনাগোনা। অর্থাৎ এখানেও আরেক দফা আয়োজন। এসব লিখতে গেলে মূল কাহিনির ট্র্যাক হারিয়ে যায় বলে আপাতত ডিটেইলসে যাচ্ছি না।

 

রেস্টহাউজের রুম মোট তিনটে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ড্রয়িং আর বাকি দুটো বেডরুম। পরিকল্পনামাফিক আমাদের থাকার ব্যবস্থা এই দুই রুমেই। খাট আছে মোট চারটে। তাতে আটজন শোওয়া যায়। বাকিরা যাতে ফ্লোরিং করতে পারে তার জন্য এক্সট্রা তোষকের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

 

রেস্টহাউজের দু'শ গজ পেছন দিকে দক্ষিণ-পূর্ব কোণ বরাবর একটা বিশাল গর্জন গাছ। অতিকায় এ-গাছটিকে ঘিরে রয়েছে নানা রকম কিচ্ছা-কাহিনি। মুন্নীদের দুই যুগ আগের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মূলেও এ-গাছটিই। সত্যিই, এত বড় গাছ সহজে চোখে পড়ে না। সবচেয়ে অদ্ভুত হচ্ছে গাছটার ডালপালার আকৃতি।

 

আমাদের কেউ কেউ গভীর রাতে সেখানে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করতেই দলের ভেতর বিভাজন দেখা দিল। নিজেকে সাহসী প্রমাণ করতে কয়েকজন যেতেই চায়। আর কয়েকজন না যাবারই পক্ষে। আর যাব-কি-যাব-না-বুঝতে-পারছি-না এরকমও আছে দুয়েকজন।

 

অত রাতে গর্জনগাছের কাছে যাওয়া ঠিক হবে কি না সে-সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমরা রেস্টহাউজের কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। কেয়ারটেকারের নাম হাফিজ। বয়স আটাশ-ত্রিশের মতো হবে। অথবা তার চেয়েও বেশি। ঠিক বোঝা যায় না। লোকটার অদ্ভুত কিছু বিষয় আছে। তার গলার স্বর চিকন, মুখে হালকা দাড়ি আর হাঁটার ধরণটাও অন্য রকম। কিছুটা ধীর লয়ে মাথা নিচু করে হাঁটে।

 

রেস্টহাউজ কিংবা গর্জন গাছটিকে ঘিরে আসলেই আধিভৌতিক কোনো ঘটনা আছে কি না তা জানার জন্য হাফিজকে ডাকা হলো।

 

পর্ব-৩
পূর্ণিমার রাতে রামু রেস্টহাউজে

 

রামু রাবার বাগানের রেস্টহাউজের কেয়ারটেকার হাফিজের কাছ থেকে যা জানা গেল :

তিন বছরের বেশি হলো হাফিজ এখানে কেয়ারটেকারের দায়িত্ব পালন করছে। রেস্টহাউজে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছে কি না জানতে চাইলে প্রথমে সে কিছু বলতে চাইল না। কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

"কী দেখছেন?"

"পরিষ্কার করে বলা মুশকিল। তবে কিছু একটা যে এখানে আছে তা অনুভব করা যায়।"

"আপনার এরকম অভিজ্ঞতা কতবার হয়েছে?"

"এই কয় বছরে তিন-চার বার হবে।"

 

আরেকটু বিস্তারিত জানতে চাইলে হাফিজ যা বলল, তার সারমর্ম হলো :

রেস্টহাউজের পেছনে যে বড় গর্জন গাছটা আছে তার বয়স দুইশ বছরের বেশি। গাছটার গোড়ার দিকে নাকি একটা সুড়ঙ্গর মতো আছে। প্রায় রাতেই ওখান থেকে নানা রকম অদ্ভুত শব্দ আসে, আর্তচিৎকারের মতো শোনা যায়। বিশেষ করে অমাবস্যা-পূর্ণিমার রাতে, আর কেউ যখন রাতের বেলায় একা থাকে তখন এ-ধরনের ঘটনা ঘটে।

 

আজ থেকে ২২ বছর আগে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের শিক্ষা-সফরে এসে মুন্নী আর তার বন্ধুরাও ঠিক এরকমই এক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল। হাফিজের অবশ্য সেকথা জানা থাকার কথা নয়।

 

এবারের সফরসঙ্গীদের মধ্যে কয়েকজনের ভূতের ভয় অত্যধিক। এতদিন যাহোক এটাসেটা বলে একটা বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করা গেছে। কিন্তু এবার তো আরও একজন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেল। তাও কিনা স্বয়ং বাগানেরই কেয়ারটেকার।

 

হাফিজের সঙ্গে কথাবার্তার খবর দ্রুতই গ্রুপের অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে গেল। তাতে প্রতিক্রিয়াও হলো ব্যাপক। বিশেষ করে রুবানার মধ্যে। সুইটি উপস্থিত থাকলে ওরও হতো। কিন্তু ও তখন রাঙামাটিতে। সে-রাতেই রেস্টহাউজে আসার কথা। এ দুজনই রামু আসার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল। ‘ভূতপ্রেত বলে কিছু নেই’, ‘সব মনের ভুল’, ‘হ্যালুসিনেশন’ এসব বলে সীমু আর মুন্নীই ওদের এ-কয়দিন শান্ত রাখার চেষ্টা করেছে। মেয়েদের মধ্যে এই দুজনই একটু ম্যাচিওরড, সাহসী। শাহী আর তুহি তেমন ভয় পায় না। যদিও শাহী নিজেও ২২ বছর আগের সেই ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী।

 

কিন্তু এ-পর্যায়ে প্রায় সবাই কমবেশি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। ভীতুদের ভয় দেখানোর এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করল কবীর আর বাবু। মুনা মধ্যবর্তী অবস্থানে। আর খোকনের আচরণ সন্দেহজনক। এই বলছে ভূত বলে কিছু নাই, একটু পর আবার বলছে কিছু একটা থাকলেও থাকতে পারে, নইলে শুধু শুধু চেয়ার থেকে ও পড়ল কেন? (পুরো ট্যুরে মোট তিনবার সে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে, যা আগে কখনো হয় নি)!

 

এদিকে কবীর সবাইকে সাবধান করতে থাকল—যেন ওদের নাম ধরে কেউ না ডাকে। সর্বনাম ব্যবহার করতে হবে। বলতে হবে ‘তেনাদের’ কিংবা ‘তেনারা’।

বাচ্চাদের এসবের কিছুই জানানো হলো না। ভয় পাওয়াদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই সমস্যা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এদিকে সুইটিরও আসার সময় ঘনিয়ে এল। রাত তখন প্রায় দশটা। পূর্ণিমার রাত।

 


পর্ব-৪

মধ্যরাতের অস্বাভাবিক যাত্রা... পূর্ণিমার রাতে, রামুর রেস্টহাউজে

 

রামু রেস্টহাউজের সে রাতে হয়তো সত্যিই অন্যরকম কিছু ঘটছিল। যার ওপর আমাদের কারও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সুইটি ফিরল রাত দশটার একটু আগে আগে। ওর কোনো সমস্যা হয় নি। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল রাত বারোটার পর থেকে, যখন আমরা রেস্টহাউজের বাইরের খোলা জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। যারা এতদিন জিন-ভূতের ভয়ে প্রবল আতঙ্কিত ছিল সেই তারাই কিনা সে-মুহূর্তে সেই রহস্যময় গাছের কাছে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। হঠাৎ এতো সাহস কোত্থেকে ভর করল তার উত্তর দেওয়া মুশকিল।

 

অথচ এই কদিন আগেই ওদের মুখ থেকে এসব গল্প শুনে সুইটি আর রুবানা ভয়ে কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুমাতেই পারে নি। সুইটি তো সে-রাতে দোয়াদরুদ পড়ে মাথার কাছে ‘কোরানশরিফ’ নিয়ে তারপর ঘুমিয়েছে। অথচ ওরা দুজনই এখন খুব বেশি আগ্রহী! কেন? অ্যাডভেঞ্চার? নাকি অজানা কোনো রহস্যময় টান?

 

গাছটার কাছে যাওয়া হবে কি হবে না তা নিয়ে তুমুল বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ল মধ্যবয়সী নারী-পুরুষের দলটি। টানা রাত আড়াইটা পর্যন্ত চলতে থাকে ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক। আমি কিন্তু শুরু থেকেই ওখানে যাওয়ার পক্ষে। তার কারণ, ভয়টা কাটানোরই দরকার। আমি নিজে ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না। তাই আমার একান্ত ইচ্ছা এই সুযোগে ওদের ভয়টা ভেঙে দেওয়ার।

 

২২ বছর আগে এরা যখন সদ্য যৌবনে পা দেওয়া ছেলেমেয়ে, যখন সাহসের কোনও কমতি ছিল না, তখন ভয়ে-আতঙ্কে এদের প্রত্যেকে যে অস্বাভাবিক আচরণ করেছিল, তা আমি কখনওই মেনে নিতে পারি নি। কারণ আমার স্ত্রী মুন্নীই সেদিন সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল। ওর কাছেই শুনেছি সে-রাতে এক পর্যায়ে সীমু, তিথি, শাহী আর তুপাও এমন কিছু আচরণ করে—যার কারণ আজও পর্যন্ত ওদের অজানাই রয়ে গেছে।

 

বাইশ বছর আগের সেই রাতে ওরা নাকি একসঙ্গে হাজার হাজার পশুর গর্জন শুনেছিল। আর আওয়াজটা আসছিল পূর্ব দিকের জানালা বরাবর, যেদিকটায় সেই রহস্যময় অর্জুন গাছ! সে-রাতে মুন্নীর চুল ছিঁড়েছিল, পিঠে খামচির দাগ ছিল। কে করল, কখন করল, কীভাবে করল সে-রহস্যের কিনারা আজও করা যায় নি। তবে সেদিনের পর থেকে সেই ভয় বহু বছর ধরে ওদের কয়েকজনকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাই আমার আন্তরিক ইচ্ছা, যেন গাছটার কাছে সবাইকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে আনি আর প্রমাণ করে দিই যে আসলে ভয়ের কিছু নেই।

 

কিন্তু আমার ইচ্ছাটা পুরোপুরি পূরণ হলো না। মুন্নী আর শাহী যেতে রাজিই হলো না। বাকি সবাই যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমাদের সঙ্গে কোনো অস্ত্র-শস্ত্র নেই, আছে কেবল কয়েকটা লাইটার আর মোবাইল। মুন্নী বারবার নিষেধ করছিল যেনো না যাই। কিন্তু তখন সবাই যেভাবে অদ্ভুত-ভূতে-পাওয়া আচরণ করছিল, কে শোনে কার কথা! ও আমার কাছে এসে একবার শেষ চেষ্টা করল। ফিসফিসিয়ে বলল, “তুমি সত্যিই যাবা? না গেলে হয় না? তোমার সাহস প্রমাণ করার এতো দরকারটা কী!”

 

কিন্তু কোনও বাধাই আমাদের থামাতে পারল না। অন্ধকারাচ্ছন্ন জঙ্গলের রাস্তা ধরে হাঁটতে আরম্ভ করলাম আমরা। পূর্ণিমার রাত, তবু মেঘের কারণে চারপাশে ঘুটঘুটে আঁধার।

 

এখানে যেটা না বললেই নয়, রেস্টহাউজের কেয়ারটেকার হাফিজই তখন ঘটনাটা বলেছিল, কিছুদিন আগে আর্মির একজন বড় কর্তা সকলের বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও সাহস দেখানোর উদ্দেশ্যে রাতের বেলায় ওই গাছের নিচে গিয়ে তাঁবু খাটান। কিন্তু তিনি পুরো রাত থাকতে পারেন নি। এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণ করেন। পরে লোকজন গিয়ে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে।

 

এসব ঘটনা জেনেও আমরা রওনা হলাম। ফয়েজ ভাই আর আমিই দলের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র। আমরা হাঁটছি আগে আগে।


 

পর্ব-৫
২২ বছর আগের সেই অশরীরী রাতের ঘটনা

 

পাঠকদের কথা দিয়েছিলাম রামুতে ২২ বছর আগে ঘটা সেই ভয়াবহ ঘটনাটি ভিকটিমদের জবানিতেই তুলে ধরব। কথা রাখার চেষ্টা করছি। আজকে তাদেরই একজনের থেকে শুনুন সেদিনের সে-রাতে আসলে কী ঘটেছিল, কেনই-বা রামুর স্মৃতি তাদের কাছে এত আবেগপূর্ণ। তাছাড়া ঘটনাটা জানা থাকলে আমি সাম্প্রতিক যে-ঘটনাটির কথা বর্ণনার চেষ্টা করছি তার গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করবে।

 

রামুর সেই অশরীরী রাত

(শাহেদা ফেরদৌসী মুন্নী)

রামু যেন রহস্যের চাদরে মোড়া একটা নস্টালজিয়ার নাম। রাবার বাগানের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, ইনানির জনবিরল ধু-ধু বালুকাবেলা আবিষ্কারের আনন্দ, ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হেঁটে যাওয়া, সেই অপার্থিব আলোর নিচে কয়েকটি সদ্যতরুণ প্রাণের হাসি-গল্প-আড্ডা আর গানে মেতে ওঠা—এসবই যেন স্বপ্নের মতো। তারপর সেই স্বপ্নের মধ্যে হানা দেয় দুঃস্বপ্ন। মাঝ রাতে অচেনা এক অশরীরী আতঙ্কে ঘুম ভেঙে সবার হিমশীতল চিৎকার। সেই আতঙ্কের রেশ থেকে গেছে রামু থেকে ইনানি হয়ে রাজধানী পর্যন্ত। সেই রেশ মুছে যায় নি দীর্ঘ ২১ বছরেও, হয়তো কোনো দিনই যাবার নয়!

 

সেই রাতটা ছিল আর দশটা পূর্ণিমার রাতের চেয়ে অন্য রকম। শহুরে পূর্ণিমায় আমরা যেরকম ঝাপসা চাঁদের আলো দেখে অভ্যস্ত তেমনটা নয়। চরাচর প্লাবিত ধবল জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত ছিল চারিদিক। সেই রাতে কেন যেন বিদ্যুৎ ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেড়াতে আসা কয়েকজন তরুণ-তরুণীর দল জটলা পাকিয়ে গল্প করছিল রামু রেস্টহাউজের সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠের আনাচে কানাচে। কয়েকজন বাইরে ছিল বলে রেস্টহাউজের মূল গেটটা খোলাই ছিল। সঙ্গে থাকা মফিজ স্যার বললেন গান ধরতে। হেঁড়ে গলায় বেসুরো সুরে গান চলল কিছুক্ষণ।

 

একটা পর্যায়ে শুরু হলো জিন-ভূতের গল্প বলার আসর। আধো আলো আধো অন্ধকারে গা ছমছমে পরিবেশে জমে উঠল ভূতের গল্প। একজন বলল এই রেস্টহাউজের একধারে একটা বটগাছ (নাকি গর্জন গাছ? ঠিক মনে পড়ছে না) আছে যেটার পাতা কখনও পড়ে না। আর রেস্টহাউজের চারদিক তাবিজ দিয়ে ‘বনধ্’ করা আছে, যাতে 'তেনারা’ কোনো বিপদ ঘটাতে না পারেন।

 

রাত আনুমানিক ২টা বা ৩টার দিকে সবাই একে একে ঘুমাতে চলে গেল। পরদিন ইনানি ঘুরে এসে রাতে আবার ঢাকায় জার্নি করতে হবে। নিরব নিঃস্তব্ধ রাতে শুধু একটানা ঝিঁঝি পোকার গুঞ্জন আর থেকে থেকে শেয়ালের ডাক বড্ড বেশি কানে বাজছিল। শাহীকে বললাম খাটের পাশের জানালাটা টাইট করে বন্ধ করে দিতে। অন্ধকারে বড় বড় গাছগুলির ছায়া দেখলে ভয় লাগে। ঘুমানোর আগে নৈঃশব্দের মধ্যেই কেমন যেন মোটরসাইকেলের গুমগুম শব্দের মতো কিছু শুনলাম বলে মনে হলো। অথবা হয়তো কোথাও জেনারেটর চলছে।

 

শাহীর আবার বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুম এসে যায়। আমার ঘুম আসতে একটু সময় লাগে। শুনলাম ঘুমের ঘোরেই শাহী বলছে—এত গর্জন কেন? মনে হচ্ছে হাজার হাজার পশু একসঙ্গে গর্জন করছে। আমি ওকে একটু নাড়া দিলাম। ও পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে গেল। পাশের খাটে সিমু, তুপা আর তিথি তখনও গল্প করছিল। ওদের হালকা কথাবার্তা শুনতে শুনতে কখন যেন চোখ লেগে এসেছিল। হঠাৎ কি জানি কি মনে হলো, হুট করে ঘুমটা ভেঙে গেল।

 

ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা ঠাণ্ডা বাতাস যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে গেল। সেই বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে আমিও যেন উড়ে চললাম। আমার মনে হলো আমি হাওয়ায় ভেসে উড়ে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছিল দরজাটা বন্ধ কেন? আমাকে দরজাটা খুলে বাইরে যেতে হবে। ঘরটা আমাদের জন্য নিরাপদ না। কিন্তু আমি কী করছিলাম নিজেই বুঝতে পারছিলাম না। শুধু মনে আছে দরজাটা খুলতে পারি নি আর ভীষণ এক ভয়ে সবাই মিলে অনেকক্ষণ ধরে গলা ফাটিয়ে রক্ত হিম করা চিৎকার করছিলাম।

 

পরে ঐ খাটে শোয়া তিনজন আমাকে বলেছে আমি নাকি দৌড়ে গিয়ে আমাদের পাশের খাটের ডানদিকে থাকা সিমুর চুল টেনে ধরেছিলাম। আর সিমু তার চুল ছাড়াতে লম্বা নখ দিয়ে আমাকে আঁচড়ে দিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ চিৎকার করার পর মফিজ স্যার আর পাশের রুমের ছেলেরা এসে দরজা ধাক্কাধাক্কি করার পর আমাদের কেউ একজন (সম্ভবত শাহী) দরজা খুলে দিল। আমাদের মধ্যে ওই সবচেয়ে তাড়াতাড়ি সামলে নিয়েছিল নিজেকে।

 

আমি তখন রীতিমতো থরথর করে কাঁপছি। অনেকক্ষণ লাগে সেই কাঁপুনি থামতে। রেস্টহাউজের কেয়ারটেকার (না কি দারোয়ান?) কিছু দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে লবণ-পানি খেতে দেয় আমাদেরকে। কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর সবাই জিজ্ঞেস করে আমাদের কী হয়েছিল। কিন্তু এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর আমাদের কারও কাছেই ছিল না।

 

পরের দিন সবাই যার যার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিল। কিন্তু কিছু প্রশ্নের ব্যাখ্যা কেউ কখনও খুঁজে পাই নি। যেমন, বন্ধু মাজহারের নাকি মনে হয়েছিল পাশের রুমের মেয়েরা বিপদে পড়েছে, ওদের কাছে যেতে হবে। কিন্তু কোনও এক অদৃশ্য শক্তি ওকে যেতে দিচ্ছিল না। অন্য এক বন্ধুর মনে হয়েছে মেয়েরা মজা করছে (যদিও এরকম আতঙ্কিত চিৎকারকে তার কেন মজা বলে মনে হলো সেটার কোনও ব্যাখ্যা ছিল না ওর কাছে)। আমাদের পাশের খাটের মেয়েদের মনে হয়েছে অদৃশ্য কেউ বা কিছু যেন তাদেরকে খাটের সঙ্গে আটকে রেখেছিল, উঠতে দিচ্ছিল না।

 

আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের খাটের পাশের জানালাটা ঘুমানোর সময় বন্ধ করা হয়েছিল। জানালাটা বেশ টাইট, ওটা খুলতে বা বন্ধ করতে যথেষ্ট শক্তির দরকার হয়। কিন্তু সকালে খেয়াল করলাম জানালাটা খোলা। সবাইকে জিজ্ঞেস করাতে বলল কেউ ওটা খোলে নি। আমাদের বিছানার বালিশ সকালবেলায় পেলাম ওদের বিছানায় (ওটা আমার ধাক্কাতেও ঐ খাটে উড়ে গিয়ে পড়তে পারে, হয়তো আমি বুঝতে পারি নি)। আমার হাতে, পিঠে অনেকগুলি নখের আঁচড়ের দাগ চোখে পড়ল (পরে জেনেছিলাম ঐটা সিমুর কাজ হতে পারে)। বাথরুমের কাঁচের তাকটা ভাঙা পেলাম, অথচ আমরা কেউ কিছু ভাঙার শব্দ পাই নি—এরকম আরও ছোট ছোট ব্যাখ্যাতীত কিছু ঘটনা।

 

পরদিন রাতে আমাদের ঢাকায় ফেরার পালা। ঢালু টিলার নিচে আমরা ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে দাঁড়ালাম বাসের জন্য। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার অনেক পরেও বাস দেখি আর আসে না। কেউ কেউ বলতে শুরু করল—ওরা মনে হয় আমাদের ঢাকায় ফিরে যেতে দিতে চায় না! মনের মধ্যে আবার এক অস্বাভাবিক ভয়ের অনুভূতি শুরু হলো। বর্ণনা করা যায় না এমন ভয়। যেন অনন্তকাল অপেক্ষার পর বাস এল আর আমরা তাতে চড়ে বসলাম। তারপর কীভাবে যে ঢাকায় ফিরলাম, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটালাম, বিষণ্ণতা বলে একটা অনুভূতির সঙ্গে জীবনে প্রথম পরিচিত হলাম, একটু শব্দ হলেই চমকে উঠতাম, একটু বাতাস বয়ে গেলেই শিউরে উঠতাম—সেইসব দিনের স্মৃতি আর মনে করতে চাই না।

 

 

অন্তিম-পর্ব

পূর্ণিমার আবছা অন্ধকারে অজানা আতঙ্কে

 

ছোটবেলায় ‘দ্য এক্স ফাইলস্’ নামের একটা সিরিজ দেখাত বি.টি.ভি.তে। সেখানে এমন কিছু ঘটনা ঘটত যার সঠিক কোনও ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায় না। প্রতিটি পর্বের শুরুতে বা শেষে একটা লেখা স্ক্রিনে ভেসে উঠত—দেয়ারস্ সামথিং আউট দেয়ার—মানে “কিছু একটা ওখানে আছে”।

 

রামু রেস্টহাউজে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পর পর সাজালে বা লজিক খুঁজতে গেলেও সেরকম শক্ত কোনো যুক্তি পাওয়া যায় না। তার মানে যে-কারুর মনে হতেই পারে যে, কিছু একটা ওখানে ছিল।

 

বাইশ বছর আগে যারা ওখানে অশরীরী আত্মার কাছাকাছি এসে ভয় পেয়েছিল, তারাও এতকাল চেষ্টা করে সঠিক কোনও কারণ বার করতে পারে নি। বাইশ বছর পর এসে আবার সেই একই জায়গায় যা যা ঘটল তার সবকিছুর ব্যাখ্যা দাঁড় করানো মুশকিল। তবে এটা ঠিক যে সে-রাতে রহস্যে ঘেরা গর্জন গাছটির দিকে যখন রওনা হলাম তখন প্রথম দিকে সবার ভেতর একটা জোশ কাজ করছিল। একে তো আমরা এতগুলো মানুষ একসঙ্গে, তার ওপর দিনের বেলায় গিয়ে জায়গাটা একবার রেকি করে আসা হয়েছিল। সব মিলিয়ে আমরা বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে কিছুই হবে না।

 

আমরা ভুল ভেবেছিলাম। অবশ্য মনের মধ্যে একেবারেই যে কোনো আশঙ্কা কাজ করে নি, তাও কিন্তু না। দুয়েকটা বিষয়ে আমার অন্তত একটু খটকা লাগছিল। যেমন, এত দিন ধরে এ রেস্টহাউজে আসার ব্যাপারে যার সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল, সেই মানুষটিই কেন হঠাৎ মাঝরাত্তিরে রহস্যময় সেই ভূতুড়ে গাছের কাছে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল! শুধু তাই নয়, এক পর্যায়ে সে তো কবীরকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জই ছুঁড়ে দিল।

 

আরও একটা অদ্ভুত ঘটনা এরই মধ্যে ঘটে যায়। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কাউকে কিছু না বলে শাহী হঠাৎ রাবার-বাগানের দিকে একা একা হাঁটা আরম্ভ করল। যাহোক, কোনও বিপদ ঘটার আগেই পেছন পেছন দৌড়ে গিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনা হলো। বাইশ বছর আগের সে-রাতেও নাকি কী এক কারণে মন খারাপ করে শাহী একাই গেট থেকে বেরিয়ে রাবার-বাগানের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করেছিল। এদিনও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো।

 

আরও একটা ব্যাপার, সে-রাতে বাবু, যে কিনা এমনিতে খুব চুপচাপ স্বভাবের, সে প্রচুর কথা বলছিল। আর হাসছিলও খুব। বাবু এমনিতে বেশ সাহসী। কিন্তু সেদিন ও কেন জানি গর্জন গাছের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে সবাইকে নিরস্ত করারই চেষ্টা করছিল। আর একবার যখন সিদ্ধান্ত হয়েই গেল যে যাওয়া হচ্ছেই, তখন বাবু বারবার সবাইকে সাবধান করে বলছিল, ঠিক আছে, যাচ্ছ ভালো কথা, কিন্তু কেউ ছবি তোলার চেষ্টা কইরো না, তাহলে কিন্তু সমস্যা হতে পারে!

 

এদিকে সে-রাতে সবাই যখন বাইরে বসে আড্ডা দিচ্ছিল তখন সবার অলক্ষ্যে আরও একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে যায়, যা আমি ওদের কাউকেই এত দিন বলি নি।

 

রাত তখন প্রায় দেড়টার মতো। প্রকৃতির ডাক আসায় আমি আড্ডা থেকে উঠে এলাম। কিন্তু টয়লেটে না গিয়ে আমি সোজা বাগানের দিকে হাঁটা ধরি। একাই। যাবার সময়ে পেছন থেকে দলের কেউ কেউ হা হা করে উঠল— “আরে দিপু ভাই আপনি কই যান?” ‘আসতেছি’ বলে আমি গেইট থেকে বেরিয়ে যাই।

 

রেস্টহাউজের গেট বরাবর ইট বিছানো রাস্তা, যেটা সোজা বেশ কিছুদূর গিয়ে নেমে গেছে খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। দু’পাশে রাবার-বাগান। হঠাৎ কী যেন মনে হলো। কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। মনে হলো এই সেই বাগান, সেই রেস্টহাউজ, যেখানে আমার জন্ম। এখানকার প্রকৃতি তখন অনেক বেশি নির্জন ছিল। ঠিক সে-মুহুর্তে আম্মার কাছ থেকে শোনা একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল।

 

এক রাতে আম্মা কী একটা কাজে ঘরের বাইরে বারান্দায় এসেছিলেন। আব্বা সেদিন বাসায় নেই, ঢাকায়। আমার মেঝো বোন তখন পেটে। আম্মা দেখলেন বাগানের একপাশের ঝোপের ওপর অসংখ্য জোনাকি এক জায়গায় জড়ো হয়ে কোনো একটা প্রাণীর আকৃতি ধারণ করছে, কুকুর বা শেয়াল জাতীয় কিছু একটা হবে। আমার আম্মা অনেক সাহসী মানুষ। তাও তিনি ওখানে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার রিস্ক নিলেন না। দ্রুতই আবার ঘরে ঢুকে পড়েন।

 

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দিতে যে-মুহুর্তে এসব কথা ভাবছিলাম, ঠিক তক্ষুণি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমার কিছুদূর সামনেই, প্রায় নব্বুই ডিগ্রি কোণ বরাবর, একটা আলোর কুণ্ডলি! আমার থেকে বড়জোর শ’তিনেক হাত দূরে। হঠাৎ মনে হলো নীলচে রঙের আলোর পাকানো দলাটা এদিকেই ভেসে ভেসে আসছে, খানিকটা নেচে নেচে, উপর-নিচ করতে করতে। আমি ভয় পেলাম। বেশ ভয়। আমার হিসু বন্ধ হয়ে গেল! মুহুর্তমাত্র দেরি না করে আমি রেস্টহাউজে ফিরে গেলাম। দৌড়েই। মেইন গেটের কাছে গিয়ে দৌড়ের গতি কমিয়ে দিই। এ-পর্যায়ে এসে সবার কাছে নিজেকে ভীতু প্রমাণ করার কোনও মানে হয় না। এও চিন্তা করলাম যে, ঘটনাটা চেপে যাওয়াই ভালো হবে।

 

যাইহোক, আবারো মূল ঘটনায় ফিরে যাই। রাত আড়াইটের দিকে, সবাই যখন গর্জন গাছের দিকে রওনা হচ্ছি, দেখি মুন্নী কাতর নয়নে তাকিয়ে আছে, আমার দিকে। শাহীও, তবে ওর দৃষ্টিতে অতটা কাতর ভাব নেই। পরে জেনেছি শাহীর নাকি আমাদের সঙ্গে যাবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু মুন্নী একা থাকবে বলে আর যায় নি।

 

পরে মুন্নীর কাছে শুনেছি, ও আসলে টেনশন করছিল বাচ্চাদের নিয়ে। কারণ বাচ্চারা তখন ওই রুমটাতেই বসে গল্প করছিল, যা ২২ বছর আগের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার সাক্ষী।

 

এদিকে বেরোতে গিয়েই দেখা গেল মেইন গেটে তালা মারা। ডাকা হলো কেয়ারটেকার হাফিজকে। গেটও খোলা হলো। তবে কখন সে এসে দরজাটা খুলল তা আমার চোখ এড়িয়ে যায়। আর কেউ দেখেছে কি না জানি না। সে কি হাফিজই ছিল? নাকি অন্য কেউ?