দিচক্রযানে কেওক্রাডং

লেখাঃ চরন্তি ডেস্ক

শনিবার, ২৮শে মে, ২০২২

সাইকেলে চড়ে এ পর্যন্ত দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে চলেছে এরকম অনেকের কথাই শুনেছি। কিন্তু সাইকেল নিয়ে পাহাড়কে জয় করা ! সত্যিই একটা এ্যকসাইটিং ব্যাপার। আর এ ব্যাপারটিকেই বাস্তবে রুপ দিতে প্রস্তুতি শুরু করলাম।  এই অভিযাত্রার নাম দেওয়া হলো মাউন্টেন বাইকিং এক্রপিডিশন। আমরা কেওক্রাডং টিমের কয়েকজন এ অসাধ্যকে সাধন করতে ছুটে গিয়েছিলাম গত বছরের কোরবানীর ঈদে। দিচক্রযানে কেওক্রাডং যাবো, তার জন্য সবার মধ্যে প্রস্তুতির কোন কমতি ছিল না। আর প্রথম থেকেই এর সাহস যুগিয়ে এসেছে ইমরান ভাই।  এ এ্যডভেঞ্চারাস যাত্রায় আমরা সঙ্গী হলাম মোট আটজন। সাথে সাইকেল পাঁচটি এবং একটি মোটরসাইকেল, বাকিরা দুপায়ে। সাইকেল যদিও আমরা এস আলম বাসের ছাদে করে বান্দরবান নিয়ে গেছি, কিন্তু মোটরসাইকেল চালিয়ে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন আমাদের মঞ্জু ভাই।  ঈদের রাতে কমলাপুর থেকে বাস দাড়ালো রাত ১১টা ৩০ এ। ভোরের আলোয় চোখ মেলে দেখি আঁকাবাঁকা পাহাড়ের গা ঘেঁষে সবুজ বৃক্ষের সমারোহ । বাস থেকে নেমে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। যেতে হবে আমাদের অনেকখানি পথ। দলনেতা ইমরান ভাই বাসে ওঠার আগেই ব্রিফিং দিয়েছেদুজন পায়ে হাঁটবে, । সবাই যেন একে অন্যকে সাহায্য করি। কারন আমাদের পাহাড়কে জয় করতেই হবে।এবার খইক্ষণঝিরির পথ। এখানে চলাচলের একমাত্র বাহন হচ্ছে চাঁদের গাড়ি। সেই ব্রিটিশ আমলের হলেও এতে করে লোক চলছে অগণিত। ছাদের উপরে, ভেতরে এমনকি ঝুলেও কেউ কেউ। আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি ছুটে চলেছে অবিরাম। জিপ গাড়িগুলোকে এখানে চাঁদের গাড়ি বলে চেনে সবাই। যেতে সময় লাগলো প্রায় এক-দেড় ঘণ্টা।  খইক্ষণঝিরি পৌঁছলাম সাড়ে ৯টায়। এবার খরস্রোতা শঙ্খ নদী পার হতে হবে নৌকা দিয়ে। এ নদীর আছে মন উজাড় করা শোভা। পাহাড়ি জনপদের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা নদী। সময় লাগবে এক ঘণ্টার মতো। ছইওয়ালা ছোট নৌকায় আমাদের হাঁটা পায়ের দুজন চড়ে বসল। আর বাকিরা দিচক্রযানে ছুটে চলা শুরু করল দুর্গম পথের। শঙ্খ নদীর বাঁকগুলো সত্যি অসাধারণ। পানি অল্প কিন্তু এত স্বচ্ছ যে, তলদেশে সব দেখা যায়। শ্যাওলা জড়ানো পাথরের টুকরো, পড়ে থাকা শঙ্খ আর লাল-নীল-হলুদ রঙের মাছের জলকেলি তাতে খেলা করে। আশপাশের ঝরনাধারা থেকে চুইয়ে পড়ছে সুমিষ্ঠ পানীয়। আর তা এসে মিশে যাচ্ছে স্বচ্ছ জলে।

দিচক্রযানে কেওক্রাডং

রুমাবাজার পৌঁছাতে ভর দুপুর হলো। সবাই মিলে দুপুরের খাওয়া সেরে প্রস্টত হলাম কেওত্রক্রাডংয়ের চড়াকে জয় করতে। মূলত রুমাবাজার থেকেই কেওক্রাডংয়ের মূল রাস্তা শুরু। রুমাবাজার পড়েছে রুমা উপজেলার মধ্যে, যার আয়তন ৪৯২.১০ বর্গ কিলোমিটার। এখান থেকে পায়ে হাঁটার পথ একদিকে চলে গেছে, যেখানে পড়বে লাইলংছড়ি পাহাড়, উচ্চতা যার ১ হাজার ২০০ ফুট। আরো আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে যেতে হবে বহুদূরের বগা লেকের পথ। আমরা যেহেতু সাইকেল আরোহী তাই গাড়ির রাস্তাকে বেছে নিলাম। এ রাস্তা দিয়ে পাহাড়িদের খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, কাঠ আনা-নেওয়া করা হয়। পাহাড়ী পথে স্যালাইন, গ্লুকোজ, মিষ্টি জাতীয় খাবার খেয়ে শরীরে শক্তি সঞ্চয় করেছি। এর মধ্যে সূর্য তার আলো দেওয়া বন্ধ করেছে। আকাশে জেগেছে পূর্ণিমার চাঁদ। তার বন্ধু আমরা আর তারারা। চাঁদের ওই আলোটুকু আমাদের পথ দেখিয়েছে ক্ষণে ক্ষণে।

দিচক্রযানে কেওক্রাডং

চলতে চলতে আমরা হাঁপিয়ে পড়েছি। বগা লেকের রাস্তাটুকু বেশ উচুঁ আর খাড়া। কখনো মনে হচ্ছে এই বুঝি পথ শেষ আবার কখনো মনে হয় এই পথের বুঝি আর শেষ নেই। আমরা যখন বেশ ক্লান্ত তখন নাজাম ভাই এগিয়ে গিয়ে সুখবর জানালো, আর একটু পথ এগোলেই বগা লেক। ধরে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম আমরা। রাত তখন ১১.৩০ বাজে। ঠান্ডা হিম শীতল বাতাস, এর উপরে ভারি ব্যাগ আর সাইকেল। বগা লেক পৌঁছতেই আনন্দে উৎফুল­ হয়ে উঠলাম। জ্যোৎস্নার আলোতে লেকের চারপাশ যেন ঝলমল করছিল। কী অসম্ভব সুন্দর বগা লেক ! কী মোহনীয় তার রূপ! ভোরের আলোতেই তার প্রমাণ পেলাম। রাতে তাঁবু করে সবাই ঘুমিয়েছিলাম। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য দার্জিলিংপাড়ার পথে। তারপরই কেওক্রাডং। তবে আজকের রাতেই আমাদের পৌঁছতে হবে একদম চূড়াতে এমনটাই নির্দেশ দিলেন ইমরান ভাই।

দিচক্রযানে কেওক্রাডং

সামনের পথটুকু আরো দুর্গম। পাড়ি দিতে হবে বহু পাহাড়, পর্বত, ঝরনাধারা, বৃক্ষের সমারোহ। একে একে সাইকেল চলতে শুরু করল। এবার বগা লেক থেকে আমরা একজন পোর্টারও নিয়ে নিলাম। এখানে পথ চলতে গাইড বা পোর্টার অনেক কাজে লাগে। বগালেক থেকে আমরা অন্য পথ ধরলাম। সেখানে ঝরনা ও ঝিরি আছে। রাস্তাও বেশ দুর্গম

উঁচু-নিচু পাহাড়ের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সাইকেল পার করা ছিল সত্যিই এক এ্যডভেঞ্চার। আমরা একে অপরকে সাহায্য করেছি। ঝরনার পানি খেয়ে তৃপ্তি মিটিয়েছি। এ পথে সাইকেল চড়তে পেরেছি খুব কমই। ঠেলতে হয়েছে বেশি। চলতে চলতে যারাই আমাদের দেখছে একবার করে থেমেছে আর হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। আমরা নাকি পারবো না।

আমরা ততক্ষণে সাইকেল নিয়ে পার হয়েছি আরো একটি বড় ঝরনা আর অমসৃণ কিছু পথ। বিকাল ৩টায় অবশেষে দার্জিলিং পাহাড় মুখ দেখলাম।

দিচক্রযানে কেওক্রাডং

সেখান থেকেই অল্প দূরে কেওক্রাডংয়ের চূড়া। পায়ে হেঁটে ১৫ মিনিটের পথ। দার্জিলিং পাড়ায় লোক কয়েকের বাসস্থান। চায়ের হোটেল আছে, দোকান আছে, মানুষের মন আছে। সেই মনে দূর থেকে আসা আমাদের মতো মানুষের জন্য মায়া আছে। দার্জিলিংপাড়ায় আমরা উঠেছিলাম কারবারি সাংসিময়ের বাড়িতে। সেখানে পাড়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য থাকে হেডম্যান। অনেকগুলো পাড়া দেখভাল করে সেই হেডম্যান। আর একেকটি পাড়া দেখে কারবারি। তার বাড়িতে রান্না করেছে ইমরান ভাই।

দিচক্রযানে কেওক্রাডং

এখানে বম উপজাতির বাস। দেখতে চাকমা এবং মারমাদের মতোই। বম শব্দের অর্থ হলো বন্ধন। প্রত্যেকেই সম্মিলিতভাবে সব কাজ করে বলেই তাদের এ বন্ধন। তাদের প্রধান কাজ জুম চাষ। ঘরগুলো তৈরি বাঁশ দিয়ে। অনন্য এক শিল্পরুপের ছোঁয়া তাতে। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পরই শুরু করলাম শেষ গন্তব্যের দিকে যাত্রা। রাতে আমরা অবস্থান নেব বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায়। রাত ১১.২০ মিনিটে রওনা দিয়ে ৩৬ মিনিটে পৌঁছে গেছি কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়। আমাদের ওপর দিয়ে যেন এক পশলা আনন্দ বৃষ্টি বয়ে গেল। আমি, নাজাম ভাই আর জিতু তিনজন প্রথমবারের মতো কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় পা দিলাম। বাঁধানো সিঁড়ি করা হয়েছে সেখানে, আর উপরে একটি সিমেন্টের বসার জায়গা। এতদূর এসে প্রকৃতির সঙ্গে অপ্রাকৃতিক কিছু দেখব আশা করিনি। ঠান্ডা বাতাস আর পূর্ণিমার আলোতে তাঁবু ফেলা হলো। সবাই আনন্দ ভাগাভাগি করে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়লাম। আনন্দের সময়গুলো যেন জলদি ফুরিয়ে যায়। এবার ফেরার পালা। শেষবারের মতো দুচোখ ভরে দেখে নিলাম পাহাড়ের চূড়া থেকে ওই দূরে পিঁপড়েদের বাসস্থান। যার উচ্চতা ৩১৭২ ফুট। প্রথম যিনি এই কেওত্রক্রাডংয়ের চূড়া আবিষ্কার করলেন তার স্মৃতিফলক আছে সেখানে। তার নাম এ এম মোরশেদ। তিনি ১৯৯৩ সালের ২ মার্চ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩৮ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হয়ে এ চূড়ায় এসেছিলেন। নেমে এলাম দার্জিলিং পাড়ায়। কারবারির বাড়িতে উথাউ ফাংনামে এক ধরনের পিঠা খেলাম, যাকে বলে বিন্নি চাল।  ফুটফুটে একটা মেয়ে আছে তাদের নাম  নো বিয়াল। বিদায়ের সময় তাকে বললাম  নাং আদো। মানে তুমি সুন্দর। আর ফিরতি পথে সবাইকে বলে চললাম বম ভাষায় কলোমে, মানে ধন্যবাদ।

দিচক্রযানে কেওক্রাডং

দার্জিলিংপাড়া থেকে চলা শুরু করলাম বগা লেকের দিকে। পৌঁছতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগল। আবারো সেই উঁচু-নিচু পথ। যেটুকু উঠতে কষ্ট হয়েছিল এবার ফেরার পথে নামতে আরাম হয়েছে।

বগা লেকে ফিরে আসার পর অন্যরা একটু অবাকই হলো যে, আমরা পেরেছি পাহাড়কে জয় করতে। বগা লেকে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম সবাই। প্রকৃতির মাধুরী মেশানো বগা লেককে আরেকবার ভালো করে দেখে নিলাম। ছুঁয়ে নিলাম অঙ্গে। বগা লেকের তিনদিক বেষ্টিত ৪৬ মিটার পর্যন্ত উঁচু বাঁশঝাড়ে আবৃত পর্বত দিয়ে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৫৭ মিটার ও ৬১০ মিটার উচ্চতার মধ্যবর্তী স্থানের একটি মালভমিতে অবস্থিত। এর গভীরতা ৩৮ মিটার। বগা লেকের সৃষ্টি নিয়ে রয়েছে আরো অনেক পৌরাণিক কাহিনী। বাংলাদেশের উচ্চতম হ্রদ বলা হয় এ বগা লেককে।

দিচক্রযানে কেওক্রাডং

রাতটা কাটালাম কেওক্রাডং বোর্ডিংয়ে আর রান্না করে সবাই খেলাম পালিয়ানের বাসায়। মেন্যু ছিল খিচুড়ি, ডিম ভুনা, বেগুন ভর্তা, ভাজি আর পেঁয়াজের চাটনি। পরদিন সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু করলাম খইক্ষণঝিরির দিকে যাত্রা। পথে আবার  শঙ্খ নদী। সবাই কাঁধে নিল সাইকেল। বেশ খানিকক্ষণ ট্রেকিং করে দেখা পেলাম পাকা রাস্টøার। উঁচু-নিচু কি দারুণ সে রেখার সমীকরণ। একটু উঠছি আর নেমে যাচ্ছি তার তিনগুণ। সাইকেলের গতি যেন বাইকের বরাবরে এসে মিলল। বেশ মজা পাচ্ছিলাম। ১টার ভেতরে পৌঁছে গেলাম খইক্ষণঝিরি। এরপর চান্দের গাড়ি। আমাদের ঢাকার বাস ছেড়ে যাবে রাত ৮টায়। সবাই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। যেটুকু সময় হাতে ছিল হাসি আর আনন্দে কেটেছে। সে দিনগুলো যেন এখনো স্মৃতির জালে আটকা পড়ে আছে। আবার কবে যাবো ঐ দূর পাহাড়ে।