পারিল গাঁয়ে বৈশাখী উৎসব ১৪১৬

লেখাঃ চরন্তি ডেস্ক

শনিবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০২২

তুমি যাবে ভাই আমাদের ছোট গাঁ’য়

নুরালিগঙ্গা’র বুক এখন শীর্ণ। সেই যে ছোটবেলায় মুখস্থ হয়েছে, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’—সেই ছোট নদী। পারিল গ্রামের মাতৃসমা, স্তন্যদানে ক্লান্ত। তবে বর্ষায় এখনও ফুঁসে ওঠে, কাদের ওপর যেন ভীষণ রাগ। তাই পারিলের মানুষেরা এখনও শ্রদ্ধায়, ভয়ে, ভালোবাসায় নিত্যদিন তাকে দেখে। তার সঙ্গে গল্প চলে ফসলের, বৃষ্টির, বাসরের।

পারিল আর কত দূর, এইতো নগরের দুয়ার ছেড়ে বেরোলে সাভারের আগেই হেমায়েতপুর হয়ে বাঁহাতি পথ চলে গেছে সিঙাইর। সেপথে বড়জোর ঘণ্টাদেড়েক। জেলার পরিচয়ে মানিকগঞ্জ। পারিলের নিজের মা নুরালিগঙ্গা, আর বড়মা কালীগঙ্গা। আহা, কালীগঙ্গাও বুঝি আজ মৃতপ্রায়! যে-কালীগঙ্গাকে মোটরে চড়ে আরিচার পথে গেলে দেখা মেলে ত্বরা সেতু পেরোবার সময়ে। কালীগঙ্গা পারিল থেকে মাত্র দু-তিন কিলোমিটার হবে। 

গাঁয়ের নাম পারিল। জসিমউদ্দীনের যেকোনো এক গ্রাম। এ-গাঁয়ে রূপাই’র মতো বীর লেঠেল না থাকলেও লাঠিখেলায় পারদর্শী সরদারেরা আছেন। আর নুরালিগঙ্গার তীরে তীরে হরহামেশাই বেজে ওঠে দোতরা, সারিন্দা, সরাজ, আর দরাজ গলায় গেয়ে ওঠে কোনো গায়েন নয়তো বয়াতি। অঘ্রাণের ধানকাটা হলে শীতের আমেজে নানান বৈঠক। কোথাও গাজীর গান, কোথাও বিচার গান, কোথাও কবির লড়াই, কোথাওবা কেঁদে ওঠে ইন্দ্রের সভায় মনসার আকুল নৃত্য। প্রবাদপ্রতিম হাকিম আলী গায়েন-এর পূণ্যস্মৃতি এখনো এ-এলাকার বট-পাকুর-অশ্বত্থের পাতায় পাতায় শিস দিয়ে যায়। ভোর হতেই উঠানে ছুটে বেড়ায় দেবশিশুর মতো ছোট্ট গো-শাবক। রান্নাঘরের ফাঁক দিয়ে ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে আসে পায়েস-পুলি আর নিজস্ব ঢঙের হরেক পিঠার সুঘ্রাণ।

 

পারিল গাঁয়ে বৈশাখী উৎসব ১৪১৬

নুরালিগঙ্গা’র পাড়ে পারিল গ্রাম

যে-গাঁয়ে এমন করে মানুষ বাঁচে, সেইতো আমার বাংলাদেশের হৃদয়। এ-গাঁয়ে সর্বধর্মের মানুষের মনে শান্তি। এখানে তাই বড় হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের পার্বণ—বৈশাখ। নববর্ষে শিশু-কিশোরেরা নতুন জামা পরে। ঘরে ঘরে নতুন খাদ্যের আয়োজন হয়। কত রকম পিঠা, মুড়ি-মুড়কি-মোয়া, সর্ষে-ইলিশ, ভাজি-ভর্তা-পান্তা। দিনভর গাঁয়ের মাঠে জমে ওঠে লোকজ খেলা। কত গান, কত খেলা, কত আনন্দ—প্রাণের মেলা! আহা কী বিস্ময়, কী বিস্ময়! আমরা নগরে এমন অকৃত্রিম, অনাবিল, সরল রঙে রাঙানো বৈশাখী মেলা দেখেছি কি কখনো?

তবে, এই নগরে এক ভ্রমণপাগল দল আছে—বি.টি.ই.এফ—যারা বছরভর কাজের ফাঁকে ঘুরে বেড়ায় দেশের আনাচে কানাচে, মানে সচরাচর আমাদের দেশের মানুষেরা এখনও যেসব গন্তব্যকে ভ্রমণের সূচিতে মানিয়ে ওঠে নি। সেইসব মণিকোঠায় লুকিয়ে থাকা গন্তব্য খুঁজে বেড়ায়, তারপর কেউ লেখে, কেউ ছবি তোলে। কিন্তু তাতেও মন ভরে না। তাদের উপলব্ধি হয়, এই যে এত এত আপন গুণে ধনাঢ্য সব গ্রাম-গঞ্জ, সারা বছরই দেশের কোথাও না কোথাও একটা পার্বণ, নাহয় মেলা, নাহয় উৎসব লেগেই আছে। আমাদের নাগরিকদের এসব মেলা দেখিয়ে আনার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়। ব্যস। এভাবেই গতবছর বৈশাখী মেলা উদযাপন হলো যমুনাপাড়ের গ্রাম অর্জুনা’য়। আর এবার নিশান উড়িয়েছে পারিল-এ। দু’দিনব্যাপী কবিগান, সঙ, ভাসানযাত্রা, লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, লোকজ খেলা, ঢাকের বাদ্য, গ্রামীণ খাদ্য, রঙিন মেলা, ফানুস ওড়ানো আর হাজার লোকের সমাগমে সে এক জমজমাট আনন্দ ! পারিলবাসীর এখন দারুণ উৎসাহ। চলছে মেলা আয়োজনের নানান প্রস্তুতি। পারিল গ্রামের ছেলেরা মেয়েরা এখন গান বাঁধছে—আমার বাড়ি যাইও ভ্রমর বসতে দিব পিঁড়ে, জলপান যে করতে দিব শালি ধানের চিড়ে।
 

পারিল গ্রামের মেলা

বর্ষবিদায় : ৩০ চৈত্র ১৪১৫ (১৩ এপ্রিল ২০০৮)

পারিল এক শান্ত-সরল গ্রাম, পাখির কলকাকলিতে ভরা। বিচিত্র রকমের গাছগাছালি সেখানে। দেড়শ বছরের বটগাছটার নিচে এসে যখন দাঁড়ালাম, কেমন যেন শান্তির পরশ অনুভব করলাম। এখানে চৈত্র-সংক্রান্তির পূজা হয় প্রতিবছর। গত বছর যারা পূজা দিতে এসেছিল তাদের আনা কারুকার্যময় মাটির পুতুলগুলো ঠিক সেভাবেই সাজানো আছে, যেভাবে মানত করেছিল পূণ্যার্থীরা। মূল কাণ্ড ছাড়িয়ে মহীরুহের শাখা বিস্তার করেছে বহুদূর পর্যন্ত। আমরা সেখানে বিশ্রাম নিই।

ঢাকা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার পথ ঋষিবাড়ি, তারপর টেম্পুতে পারিল গ্রাম। এ-গ্রামে ড. নওয়াজেশ আহমদ-এর বাড়ি, সবাই তাঁকে একজন প্রকৃতিবিদ ও আলোকচিত্রী হিসাবেই জানে। তাঁদের বাড়িটি তৈরি হয়েছিল ১৮৯৪ সালে, নাম ‘জোহরা মঞ্জিল’। এখনো রাজকীয় একটা গাম্ভীর্য আছে। ‘মানিকগঞ্জের শত মানিক’ বইতে তাঁদের বংশ-পরম্পরার উল্লেখ আছে। এখন এ-বাড়িতে থাকেন নাইবউদ্দিন আহমেদ, নওয়াজেশ আহমদের বড় ভাই। তিনি একজন নিভৃতচারী প্রকৃতিপ্রেমী এবং আলোকচিত্রী। তাঁর তোলা পারিল গ্রামের পঞ্চাশ বছর আগের ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায় এ-গ্রাম আরও  কত সুন্দর ছিল ! 

এদিকে পহেলা বৈশাখেরও সময় এল। আমাদেরও ব্যস্ততা বাড়ল। বান্দরবানের রাজু দু’দিনেই বানিয়ে ফেলল চল্লিশটি ফানুস। আর ঘুড়ি বানাল অন্যরা। জায়গায়-জায়গায় পোস্টার লাগানো, বন্ধু-বান্ধবদের জানানো, মিটিং ডাকা, ব্যানার করা সবার মধ্যে অন্যরকম এক উত্তেজনা। “ভাই মেলা হবে পারিল গ্রামে—চল না সবাই!” ঘুড়ি উড়বে, ফানুস উড়বে, লাঠি খেলবে, সঙ হবে, মিঠাই-মণ্ডা, আরও কত আনন্দ।

আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রওনা দিই পারিল গ্রামের পথে—চৈত্রের শেষ দিন। আর দলনেতা গণিভাই পৌঁছে যান তারও একদিন আগে। ঐতিহ্যবাহী গাজীর গান, কবিগান, সঙ-যাত্রা করার জন্য পারিল বাজারের জায়গাটি খালি করে দেওয়া হয়। আমরা পৌঁছে দেখি গাজীর গান চলছে, পেছনে বিশাল ব্যানারে লেখা—‘এসো উড়াই বৈশাখের ফানুস’। স্লাইড শো দেখানোর জন্যে তোড়জোড় শুরু করে দলের সদস্য রীপন, ইমরান, জনি ভাইরা। এরই মধ্যে বাজার লোকে-লোকারণ্য, একজন আরেকজনের মাথা সরিয়ে প্রজেক্টরে দেখতে থাকে এ-গ্রামের ছবি, নানা উৎসবের চলচ্চিত্র। দেখানো হলো বি.টি.ই.এফ-এর ট্রাভেল-শো। রাতে খাবারের ব্যবস্থা হলো নাইবউদ্দিন সাহেবের শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা পুরনো বৈঠকখানায়। ভাত, ঘন ডাল, মুরগির মাংস—যেন সবকিছুই অমৃত। ছেলেদের থাকার ব্যবস্থা হলো ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে, আর মেয়েদর নাইবউদ্দিন সাহেবের বাড়িতে। অনুষ্ঠান কিন্তু চলল গভীর রাত পর্যন্ত। রাত যত বাড়ে, সঙযাত্রার গভীর সুরও তত গভীর হয়ে ওঠে।

বর্ষবরণ : পহেলা বৈশাখ ১৪১৬ (১৪ এপ্রিল ২০০৯)

ভোর হয়, পাখি ডেকে বলে—ওঠো, বৈশাখ এসে গেল, আমরা চোখ মেলে বলি ‘শুভ নববর্ষ’। পারিল গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ফুটফুটে মেয়েরা একই রঙের শাড়ি পরে এসেছে ; খোঁপায় গোঁজা গাঁদা ফুলের মালা। ছেলেরা পরেছে বাহারি পাঞ্জাবি। বেজে উঠল জয়ঢাক। বাজে তালে-তালে, সুরে-সুরে। সেই সুরে নেচে উঠি আমরাও। ওদের হাতে রং-বেরঙের মুখোশ তুলে দিই ; খুশি মনে তারা বৈশাখী শোভাযাত্রায় বের হয় পুরো গ্রাম জুড়ে। ফিরে এসে চলে গুণীজন সংবর্ধনা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বৈশাখের প্রথম দিনে খরতাপ যেন বেড়েই চলে—এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্যে হাঁসফাঁস করে মন। পাপন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম “পুকুরে কি বৃষ্টি নেমেছিল ?” তিনি উত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ, নেমেছিল তো’। সালমা আপা মুখের কথা কেড়ে নিলেন—‘কই, কখন বৃষ্টি হল, বলে কী ?’ আমরা সবাই হেসে উঠলাম, ‘আরে ভাই এ তো পাপন ভাইয়ের মেয়ে বৃষ্টি !’

 

পারিল গাঁয়ে বৈশাখী উৎসব ১৪১৬

মঙ্গল শোভাযাত্রা 

গরমের জ্বালা জুড়াতে পুকুরের দিকে এগোই, দেখি ধানক্ষেতের মাঝে শ্যালো ইঞ্জিনের ঝরনাধারা। এই পানিতে শরীর ভিজিয়ে পুকুরে নামি, তারপর হাপুস-হুপুস করে আবার সেই পরিষ্কার পানিতে! দুপুরের খাওয়ার সময় হল, এবারের আয়োজনে ছিল মাছভাজা, গরম ভাত, বেগুনভর্তা, করলা ভাজি, মাংস, ঘন ডাল—আহা! তারপর ছিল আবার ঘোষের দই! এ তো দেখি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। সূর্যের তেজ কমতেই সবাই মাঠের দিকে জড়ো হতে লাগল ঘুড়ি হাতে। ঘুড়ি দেখে তো আমরা হতবাক। কত যে রংবেরঙের বিচিত্র ঘুড়ি—কত তার বাহারি নাম! অনেক পরিশ্রম করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি বানিয়েছে এই মেলায় অংশগ্রহণ করার জন্য। প্রতিবছরই তারা পারিল গ্রামের এ-ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেয়।

 

পারিল গাঁয়ে বৈশাখী উৎসব ১৪১৬

বাহারি ঘুড়ি নিয়ে শিশু কিশোরদের সমাবেশ

মাঠের আরেক পাশে চলছিল লাঠি খেলা। ‘সামাল সামাল’ হুঙ্কার দিয়ে তারা একে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খেলায় খেলায় নানা কসরত দেখায় সবাইকে। মাঠ জুড়ে গুচ্ছ-গুচ্ছ আয়োজন চলতে থাকে। বানরওয়ালা খেলা দেখায়, মুড়িওয়ালা মুড়ি বানায়, রকমারি পণ্যের পসরা বসে মাঠে। সঙের দল নেচে-গেয়ে লোক হাসায়। আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে কিশোরের দল, কিন্তু বৈশাখের ঝোড়ো হাওয়ার কোনো দেখা নাই। তবুও চেষ্টা অব্যাহত থাকে। আকাশে ঘুড়িগুলো উড়ে যায় নিজের মতো করে, কিন্তু সুতোয় বাঁধা থাকে নাটাই—তার সাথে মানুষের মন। সেই মন মুক্ত, স্বাধীন, প্রকৃতিপ্রেমী, মনুষ্যপ্রেমী, দুরন্ত, চিরনবীন, উড়ন্ত মেঘদল, ফাল্গুনের গুঞ্জন, মায়াময়, চির অধরা!

 

পারিল গাঁয়ে বৈশাখী উৎসব ১৪১৬

লাঠি খেলা

আমরা মুক্ত আকাশে মুক্ত ঘুড়িগুলোর মাঝে হারিয়ে যাই। গোধূলি লগ্নে তখন লাল আভা ছড়ায়। ফানুসের প্রস্তুতি চলে। একেকটা ফানুসে অগ্নিশিখা জ্বলে আর আনন্দের উত্তেজনা বাড়ে। নীল আকাশের ধ্রুবতারা হয়ে ফানুসগুলো পৃথিবীর সব অশুভকে তুলে নিয়ে যাবে। আমরা একের পর এক ফানুস উড়িয়ে চলি, আর সবাই তালি দেয়। অবশেষে আমাদের ফেরার সময় হয়ে এল; সাতজন সাতটি ফানুস নিলাম, আগুন জ্বললো তার গোড়ায়। এক, দুই, তিন বলে ছাড়া হল সাত-সাতটি ফানুস! আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নে বিভোর হলাম। আমাদের মেলা শেষ হল সফলভাবে। ফেরার সময় নাইবউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে সবাই বিদায় নিতে গেলাম, তাঁকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাল। তিনি বললেন, আমরা যাওয়ার পরে তাঁর অনেক খারাপ লাগবে। আমরা জানি, আমাদেরও আপনাকে, আর এই সুশীতল মায়াময় গ্রামটি ছেড়ে যেতে অনেক খারাপ লাগবে। আবার মেলা হবে এই পারিল গ্রামে, আপনারা কিন্তু সবাই আসবেন।

(পাঠক, এই মেলার কিছুদিন পর ডিসেম্বর মাসে শ্রদ্ধেয় নাইবউদ্দিন আহমেদ ইহলোক ত্যাগ করেন। এবং তার মাত্র মাসখানেক পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন তাঁর অনুজ নওয়াজেশ আহমদ। তাঁদের স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।)