বুদ্ধের পথে পথে - ১
লেখাঃ মাহবুব আলম পল্লব
শনিবার, ৪ঠা জুন, ২০২২খ্রিষ্টীয় ৩৯৯ সাল। ৬৫ বছর বয়সী এক চীনা পরিব্রাজক, নাম তার ফা-হিয়েন, জ্ঞানের সন্ধানে পেরুচ্ছেন রুক্ষ গোবি মরুভূমি। জনমনিষ্যির চিহ্ন নেই দৃষ্টিসীমার কোথাও, ধু-ধু বালি শুধু। বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তরের কোনো সীমানা নেই, পথের দিশা নেই।
আছে কেবল পূর্ববর্তী পথিকদের অগ্রগতির চিহ্নস্বরূপ ইতস্তত ছড়ানো অস্থি, কঙ্কাল। সে-কঙ্কালসমূহের নিশানা ধরে এগিয়ে চলেছেন পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ও তার গুটিকয় সঙ্গী। ১৭ দিনে প্রায় ৫০০ মাইল মরুপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছুলেন শেন্ শেন্ রাজ্যে। সেখান থেকে খোটানে। এখানে মূর্তি-শোভাযাত্রা দেখে চলে আসেন চাকুকার, তারপর খালচায়। মহা পঞ্চবার্ষিকী সভা উদ্যাপন করে প্রস্ততি নেন তুষারাবৃত পামীর পার হওয়ার। এ-পথ এতই বিপদসঙ্কুল যে, দশ হাজারের মধ্যে একজন পার হতে পারে কিনা সন্দেহ। ফা-হিয়েন লিখেছেন, “এখানে এক প্রকারের সাপ বাস করে তারা রেগে গেলে এত জোরে নিশ্বাস নেয় যে বেশ জায়গা জুড়ে বালির ঝড় বয়ে যায়।”
পরিব্রাজক দলের পামীর পার হতে সময় লেগেছে এক মাস। উত্তর ভারতের উড্ভীয়ান রাজ্যে এসে পৌঁছান, তারপর যান গান্ধারে। ছয় বছর তিনি ভারত পরিভ্রমণ করেন। ভারতের বহু নগর শ্রাবস্তী, কপিলাবস্তু, কুশীনগর, বৈশালী, বুদ্ধগয়া, রাজগীর ইত্যাদি দর্শন করে তাম্রলিপ্ত হয়ে চলে যান সিংহল দ্বীপে (শ্রীলংকায়)। ১৪ বছরের ভ্রমণকাল শেষ করে সমুদ্রপথে দুষ্প্রাপ্য বৌদ্ধগ্রন্থ ও চিত্রাবলী সঙ্গে করে তিনি ৭৯ বছর বয়সে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ভগবান বুদ্ধের জন্মস্থান ও বৌদ্ধতীর্থসমূহ দর্শন এবং পণ্ডিতদের সঙ্গে শাস্ত্রালোচনার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে প্রায় বৃদ্ধ এ-ভিক্ষু পাড়ি দিয়েছেন দুর্গম গিরি কান্তার মরু। তিনি ভারতে এসেছিলেন উত্তর-পূর্ব দিক থেকে, আমরা যাচ্ছি দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে।
|
|
|
দলে ১০০ জন আমরা। সকলে তীর্থযাত্রী। বুদ্ধের চার মহাতীর্থ লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ ও কুশিনগরসহ আরও কতিপয় স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে মাসব্যাপী যাত্রার জন্য যাত্রীদল পরিজনের নিকট থেকে বিদায় প্রার্থনা করেন। দলে মহিলার সংখ্যা ত্রিশ। যাত্রীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ পঞ্চাশোর্ধ। খাগড়াছড়ি থেকে আগত মারমা দলের সদস্য সংখ্যা ২৬, বাকিরা এসেছেন চট্টগ্রামের রাউজান, চন্দনাইশ প্রভৃতি স্থান থেকে, তাঁরা বড়ুয়া বৌদ্ধ। দলে ভিক্ষু আছেন জনা-দশেক। পাড়ার নির্দিষ্ট ক্যায়াং থেকে আগত তীর্থযাত্রীদের ভ্রমণস্থলগুলো সম্যকভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ভিক্ষুদের। তাছাড়া সংঘদান, পঞ্চশীল প্রদান অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বও তাঁদের। দুপুর ১২টার পর ভিক্ষুদের চর্ব্য কিছু গ্রহণ করার নিয়ম নেই। এছাড়া ৮ জন যুবক যাচ্ছেন যাত্রীদলের সেবার নিমিত্তে, তারা স্বেচ্ছাসেবক।
রাত ১০টায় যাত্রীদল জড়ো হলো কমলাপুরের ‘ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার’-এ। আহারাদি গ্রহণ করে সোহাগ পরিবহনের দুটি বাসে চেপে যাত্রা শুরু ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বেনাপোলের উদ্দেশে। ভোর হওয়ার আগেই বেনাপোলে পৌঁছানো গেল। বর্ডার ক্রস সংক্রান্ত ঝামেলা মিটিয়ে ওপারে হরিদাসপুর। এখানে আহার গ্রহণ শেষে আমরা কোলকাতার উদ্দেশে রওনা দিলাম যশোর রোড ধরে। এ-রাস্তাটি মুঘল শাসক শের শাহ্ চালু করেছিলেন কয়েক শত বছর আগে। পথে পড়ল বনগাঁও, হাবড়া ইত্যাদি আরও অনেক জায়গা। বারাসাতে দেখি রাস্তায় শচীন তেন্ডুলকার দাঁড়িয়ে আছেন দু’ হাত তুলে। মোবাইল কোম্পানি এয়ারটেলের বিজ্ঞাপন। রাস্তায় মেয়েরা স্বচ্ছন্দে সাইকেল চালিয়ে পথ পাড়ি দিচ্ছে।
বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি রোড ধরে যাত্রীদল কলেজ স্কোয়ারে এসে পৌঁছল, ততক্ষণে সন্ধ্যা গড়িয়েছে। কলেজ স্কোয়ার পুরোটাই শিক্ষাজগৎ। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, সংস্কৃত কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজসহ অনেক বইপত্রের দোকান এ-স্কোয়ারে রয়েছে, কফি হাউজও এখানেই। আরো আছে বিদ্যাসাগর পার্ক, এর একদিকে রয়েছে অ-নাগরিক ধর্মপালের স্ট্যাচু। তিনি জন্মেছিলেন শ্রীলংকায়, স্বামী বিবেকানন্দের সমবয়সী ছিলেন, একসঙ্গে তাঁরা শিকাগোর ধর্ম-সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, জন্মভূমি ভারতবর্ষ থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ভিনদেশী শাসকদের আক্রমণের শিকার হয়ে ক্রমে ক্রমে বৌদ্ধ ধর্ম বিতাড়িত হয়েছে। এর পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু করেন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহায়তায় বৌদ্ধ স্থাপনাসমূহের পুনরুদ্ধারে মগ্ন হন। তাঁর একার পক্ষে এটি সম্ভব হয় নি। আরো অনেক বৌদ্ধ পণ্ডিতজন এবং লর্ড কানিংহাম এ-কাজে আন্তরিক ছিলেন। পালি সাহিত্য অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে এসব স্থান নির্ণয় করা সহজ হয়েছে।
অ-নাগরিক ধর্মপাল ‘মহাবোধি সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’ গঠন করেন, স্যার আশুতোষ মুখার্জী ছিলেন এর প্রথম সভাপতি। কলেজ স্কোয়ারে মহাবোধি সোসাইটির বেশ বড় কার্যালয় আছে। এর নিচতলায় হলঘরে আমাদের থাকার জায়গা হলো। বিছানা পেতে অর্থাৎ নিজের থাকার জায়গা নির্ধারণ করে হাতমুখ ধুয়ে কফি হাউজে গেলাম। একটি বড় ভবনের দোতলায় এর স্থান। কফি, কাটলেটসহ আরো কিছু মেলে। উর্দি মাথায় সাদা পোশাকের বেয়ারারা অর্ডার সার্ভ করছে। সব টেবিলেই কথার খই ফুটছে। ছাত্র-ছাত্রীরা আছে, বুড়োরাও আছে। এদের অনেকের এখানে আড্ডা দেওয়ার বয়স দুই যুগ গত হয়েছে। মান্না দে গান গেয়ে একে ব্যাপক পরিচিত করেছেন।

পরের দিন তীর্থদল সকালের নাস্তা সেরে সারি বেঁধে রওনা হলো বৌ বাজারে ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধবিহার পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে। এ-দিনটি ছিল ‘বাংলা বন্ধ’-এর দিন, সমাজতান্ত্রিক দল এস.ইউ.সি.আই ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বন্ধ ডেকেছে। রাস্তায় গাড়ি তুলনামূলকভাবে কম ছিল, কোনো গোলযোগ দেখি নি। চলার পথে দুপাশে সারি সারি পুরনো ভবন। নিচে মার্কেট, ওপরে বাসস্থান। ফুটপাতে চাকাওয়ালা লুচি-সবজির দোকান। বালুচরী, বেনারসি, মিনু শাড়ির বিজ্ঞাপন আর আছেন শচীন তেন্ডুলকার এয়ারটেলের বিলবোর্ডে। সিনেমার পোস্টার আছে কিছু, তেমন রগরগে নয়। বাংলা ছবি ‘ত্যাগ’ ও হিন্দি ‘বীরজারা’র কয়েকটি পোস্টার দেখেছি। রাস্তায় পেপার বিক্রি হচ্ছে কিছু দূর পর পর। পড়ছেও অনেকে। এখানে পেপারের দাম হাতের নাগালে, বলতে গেলে আঙুলের ডগায়। বাংলা পেপার ২ টাকা এবং ইংরেজি ১ টাকা।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম বৌ বাজারে। থানাকে ডানে রেখে যে-গলিটি পুব দিকে ঢুকে পড়েছে, ভেতরে সেখানে একটি খোলামেলা পরিসরে ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধবিহার। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে এসে ‘কৃপাশরণ মহাস্থবির’ এ-বিহার নির্মাণ করেন। এখানে তার একটি আবক্ষ মূর্তি, একটি হলরুম, পেতলের বুদ্ধমূর্তি এবং একটি ধর্মশালা আছে। চিকিৎসা বা অন্য প্রয়োজনে যারা বাংলাদেশ থেকে কোলকাতা যায় তারা এখানে থাকতে পারে। হলঘরে পঞ্চশীল প্রার্থনা করে তীর্থদল পাতাল রেল দেখতে পথে নামল।
সেন্ট্রাল নামের পাতাল রেল স্টেশন থেকে টিকিট কেটে রবীন্দ্রসদন যাওয়া ও ফিরে আসার বন্দোবস্ত হল। পাতাল রেল একটি সুন্দর যোগাযোগ মাধ্যম। শহরের তলদেশ দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতা অর্থাৎ বালিগঞ্জ ও দমদমকে পাতাল রেল সোজাসুজি জুড়ে দিয়েছে। কিছু পরপর কালিঘাট, ময়দান, চাঁদনি চক ইত্যাদি অনেক স্টপেজ। স্টেশনে টেলিভিশন আছে, অপেক্ষায় বিরক্তি আসে না। বগিতে উঠলে মাইকে তিন ভাষা বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দিতে ঘোষণা হয়, পরবর্তী স্টেশন...। চোখের সামনে বোর্ডে আঁটা আছে পুরো রোড ম্যাপ। রবীন্দ্রসদনে নেমে স্টেশন দেয়ালে চোখে পড়ল রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন এবং প্রতিকৃতি। ব্যাপারটি বেশ রুচিকর ঠেকল। জায়গার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমনটি প্রায় সব স্টেশনেই দেখা যায়। টিকিট একটি বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে তবে বেরুনোর পথ মেলে। কোনো লোক চেক করার জন্য দাঁড়িয়ে নেই।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বড় বড় বিজ্ঞাপন। রাজ্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত হচ্ছে ‘কলকাতা দশম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’। নন্দন, রবীন্দ্রসদন, আকাদমী মিলনায়তন, শিশির মঞ্চসহ আরো কয়েকটি স্থানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী চলছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘দূরত্ব’, ‘উত্তরের খেপ’ উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে। নন্দন প্রাঙ্গণ জুড়ে মেলা বসে গেছে যেন। তরুণরাই সংখ্যায় বেশি। ছবি দেখে বেরিয়ে এর নানান বিষয়ে তর্ক বা আলাপ জুড়ে দিয়েছে। পথের পাঁচালির পঞ্চাশ বছর উদ্যাপিত হচ্ছে এ উৎসবে। নন্দনের একটি হলঘরের পুরোটা মোড়ানো সত্যজিৎ রায়ের ভঙ্গিসম্বলিত বড় বড় ডিজিটাল প্রিন্টে, আরো আছে পথের পাঁচালির কোনো দৃশ্য—সেখানে দুর্গা, অপু, সর্বজয়া, হরিহর আছে। ৮/১০ ফুটের বেশ কয়েকটি ডিজিটাল স্ক্রিনে— ঝড়ের, ট্রেন দেখার, পুকুরে পোকা বেড়ানোর বা হরিহরের বাড়ি ফেরার দৃশ্যগুলো পুনঃ পুনঃ প্রদর্শিত হচ্ছে। রবীন্দ্রসদনের কাছের খোলা জায়গায় ফিল্ম মার্কেট। সেখানে বিভিন্ন ফিল্ম কোম্পানি স্টল নিয়েছে। তাদের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বেশ সময় কাটিয়ে কলেজ স্কোয়ারে ফিরে এলাম।
সন্ধ্যায় আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে, বাতাস-বালিশ কিনে দলের সবার সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে রাতের খাবার খেতে বসলাম। ঘুম মন্দ হলো না। পরের দিন সকালে উঠে কেশবচন্দ্র রোড ধরে এগুতে গিয়ে দেখি পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। মোহাম্মদপুর বিহারীপট্টির মতো একটি এলাকা। ছোট ছোট ঘর সারি দেওয়া। ফোন্ডিং খাট বিছিয়ে অবিবাহিত যুবক ও শিশুরা রাস্তায় ঘুমায়। খাটের কাছেই থাকে স্পিকারটি। সেখান থেকে উচ্চস্বরে গান বাজে। প্রত্যেক পরিবারেরই অন্তত একটি স্পিকার আছে। সেই সকালে তারা স্পিকারটি চালিয়ে দিয়ে মুখ ধুচ্ছিল পাশের পাইপ-কলে আর ‘আলিশা চিনয়’ গাইছিলেন মেড ইন ইন্ডিয়া...।
‘নেতাজী কলেজে’র কাছে যেতে টানা-রিকশাচালক মোস্তফা মিয়ার সঙ্গে দেখা হলো, তিনি যাত্রী নামিয়ে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁর পরিবার বিহারেই থাকে, দু'মাস তিন মাসে একবার সেখানে যান। পথে এক জায়গায় শনি ঠাকুরকে হাতির পিঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তাঁর কাছে গাছের নিচে আয়না টাঙিয়ে ক্ষৌরকার দিনের কাজ আরম্ভ করেছেন।
এখান থেকে বাসে চড়ে গেলাম ময়দান। বাসের গায়ে লেখা, “দিচ্ছি দিচ্ছি বলবেন না”— আমাদের এখানে যেমন লেখা থাকে, পকেটমার হতে সাবধান কিংবা ৫০০ ও ১০০ টাকার ভাংতি নেই। ময়দানে নেমে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখলাম। বিশাল জায়গা জুড়ে এ-সৌধ। অনেক স্ট্যাচু আর মেমোরিয়ালের দারুণ স্থাপনা এবং সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয় দ্রুত। ঘুরতে ঘুরতে বেলা পড়ে এলে মহাবোধি সোসাইটিতে ফিরে যাত্রীদলের মধ্যে বেশ তাড়া দেখতে পেলাম। আজ রাতেই যাত্রা শুরু হবে বুদ্ধগয়ার উদ্দেশ্যে।
আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন গনেশ ঠাকুরের নেতৃত্বাধীন পাঁচ জনের একটি পাচক দল। তারা সকালেই শেয়ালদহ বাজার থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ চাল, ডাল ও মশলা কিনে নিয়েছেন। ডেকোরেটরের দোকান থেকে ১০০টি থালা, বাটি, গ্লাস ভাড়া নিয়েছেন, কয়েক সিলিন্ডার গ্যাসও নিয়েছেন। রাজিব পরিবহনের দুটি ট্যুরিস্ট-বাস ভাড়া করা হয়েছে আমাদের পুরো যাত্রাপথের জন্য। রাতের খাবার শেষ হলে ‘গনেশ বাহিনী’ মালপত্র বাসের পেছনদিকে ওঠাতে থাকল, সেইসঙ্গে যাত্রীদলের বিছানাপত্র এবং ব্যাগসকল উঠে পড়ল বাসের ছাদে। সাধু সাধু বলে রওনা হলো যাত্রীদল।
ভোর-রাতের দিকে এক জায়গায় বেশ জটলা ও হল্লায় বাস ধীর গতির হয়েছে। দেখতে পেলাম একটি পুকুর ঘিরে অনেক লোক। পুকুরটি মশাল-বাতিতে উজ্জ্বল। পরে জেনেছি ‘ছোট পরব বা সূর্য পুজা’র আয়োজন চলছিল। সূর্য-উপাসকরা তিন দিন উপোস থেকে ভোর-রাতে পুকুরের ধারে জড়ো হয়, সূর্য উঠলে তারা উপাসনা ও স্নান সেরে ঘরে গিয়ে উপোস ভঙ্গ করে। বিহারের অনেক স্থানে এটিই প্রধান ধর্ম-উৎসব।
সকাল হয়ে এলে আসানসোলে সকালের খাবার বিরতির জন্য বাস থামল। স্থানের নামে নিগা কলিয়ারি। এটি খনিজ এলাকা; কয়লা ও পাথরের অফুরান সম্ভার। এখানে একটি ধাবার সামনে বেশ খোলা জায়গায় আমাদের রান্না ও খাওয়ার আয়োজন চলছে। যাত্রীরা কুয়ো থেকে পানি তুলে হাত-মুখ ধুয়ে কেউ কেউ খাটিয়ায় শুয়ে পড়ল। অনেকের মনে পড়ল আসানসোল কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান। এখান থেকে পুরুলিয়া মাত্র কয়েক কিলোমিটার। কাছেই কোথাও হয়তো দুখু মিয়া রুটির দোকানে কাজ করত। খেয়েদেয়ে যাত্রীদল রওনা দিল ১২টা নাগাদ।
আসানসোল পার হলে ঝাড়খন্ড, আগে বিহারের অংশ ছিল। এখন স্বতন্ত্র রাজ্য। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের অনেক চরিত্র হাওয়া বদলানোর জন্য ঝাড়খন্ডের রাঁচি বা হাজারিবাগে আসত। পথ এগুচ্ছে, বাসও। পথের নাম সংক্ষেপে জি.টি. রোড আসলে শের শাহের গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। রাস্তার দু’পাশ উষর। সবুজ নেই তেমন, আবাদ হয় না। চাড়ার ছাউনি দিয়ে মাটির ঘর। লোকজনের পোশাকে দারিদ্র্য সুস্পষ্ট। কাছেই কোথাও হয়তো পুর্ণিয়া’র জঙ্গল, যাকে উপজীব্য করে বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন আরণ্যক। সন্ধ্যায় আমরা পৌঁছলাম বুদ্ধগয়া, বিহারের রাজধানী পাটনা বা মগধ-সম্রাট অশোকের পাটলিপুত্র থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে। গয়া জেলাসদর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার।
রাজকুমার সিদ্ধার্থ এখানে বোধিবৃক্ষের তলে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। দূর থেকে বুদ্ধগয়ার আলো নজরে আসে। এ এক আলোকময় স্থান। মন্দিরের শহর—ভিয়েতনামি, তিব্বতি, থাই, জাপানি, শ্রীলংকান, বর্মী, ভুটানি, বাংলাদেশি, চীনা বৌদ্ধমন্দির অনেক। প্রতিটির রয়েছে নিজস্ব গড়ন-কাঠামো, রঙেও আলাদা। কোনোটি স্তূপাকৃতির, কোনোটি চৌকোণা। মন্দিরের প্রবেশমুখে রয়েছে ধর্মচক্র, ঘণ্টা, সিংহের মূর্তি কিংবা হরিণের দেহাবয়ব। ভেতরে রয়েছেন গৌতম বুদ্ধ ধ্যানাসনে, ভূমিস্পর্শ আসনে বা ধর্মচক্র আসনে। মন্দিরগাত্রে জাতকের বিভিন্ন কাহিনী চিত্রাকারে পরিস্ফূটিত। প্রতিটি মন্দির অনেকখানি জায়গা জুড়ে।
বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপাল ভান্তে’ গড়েছেন ইন্টারন্যাশনাল মেডিটেশন সেন্টার। বুদ্ধগয়ায় তিনি একজন সম্মানিত ভিক্ষু। বুদ্ধগয়ার অন্যতম দর্শনীয় বিষয় হলো আশি ফুট উঁচু এক বুদ্ধমূর্তি—স্যান্ডস্টোনে তৈরি। জাপানের বেসরকারি কোনো ধর্মপ্রচার প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে নির্মিত। মূর্তিচত্বর খোলামেলা, কোনো ছাউনি নেই৷ মূর্তিমুখে এগিয়ে যাওয়া পথের দু’পাশে দেবদারু গাছের সারি। যতই তার পানে এগিয়ে যাওয়া ততই যেন সে বৃহৎ হতে থাকে। বিস্ময়ের উদ্রেক হয়। মূর্তির পেছনে খোলা, ওপরে আকাশ শুধু। ভ্রম হয়, মাটি ফুঁড়ে মানবাকৃতির পাহাড় জেগেছে বুঝি। বুদ্ধের দু’পাশে আনন্দ, শারিপুত্র, মৌঙ্গল্যায়ন, মহাকাশ্যপ, উপালিসহ দশজন প্রিয় শিষ্য মূর্তি হয়ে দণ্ডায়মান।
যাহোক, আমাদের থাকার জায়গা হলো নেপালি মন্দিরে। আসলে এটি দার্জিলিঙের তামাং জনগোষ্ঠির একটি মন্দির। পরদিন খুব ভোরে যাত্রীদল যাচ্ছে মূল মন্দিরের দিকে। যত এগুচ্ছি ততই মনে অন্য অনুভব জায়গা নিচ্ছে, ভেসে আসছে বুদ্ধম শরনম গচ্ছামি...। রাস্তা থেকে চার ধাপ সিঁড়ি ওপরে উঠে গিয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণ শুরু হলো। ডান দিকে একটি বড় গেট দিয়ে ঢুকে খোলা চত্বরে জুতা খুলে এগিয়ে গেলে পশ্চিম দিকে আরেকটি গেট। এখান থেকেই সেই মহাবোধি মন্দিরটি চোখ ছুঁয়ে প্রাণের মধ্যে এসে ঠাঁই নেয়। ৮০ মিটার উঁচু দ্বিতল এ-মন্দির। গেট থেকে বেশ কিছু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলে মন্দিরে প্রবেশের পথ। দু’পাশে অনেক চৈত্য ও স্তুপ। ৫ ফুট, ১০ফুট বা তারও বেশি উচ্চতার। স্তূপগাত্রে বুদ্ধাসন এবং বোধিস্বত্ব অবস্থার চিত্র।
বিশ্বাসমতে, ২,৫৪৭ বছর পূর্বে কপিলাবস্তুতে শেষবার জন্মগ্রহণের আগে আরও ৫৫০ বার বুদ্ধ জন্ম নিয়েছিলেন এ-পৃথিবীতে। তখন তিনি মনুষ্য ও প্রাণীরূপ পেয়েছিলেন। সেসব জন্ম জাতক-কাহিনীতে বর্ণিত আছে। তখন বুদ্ধ ছিলেন বোধিস্বত্বরূপে। মন্দিরপথ ধরে হেঁটে গেলে আরও পাওয়া যাবে বৃহদাকার সব ঘণ্টা এবং খিলান। খিলানগাত্রও জাতক কাহিনীতে সজ্জিত। চৈত্য, খিলান স্তুপাসমূহ বালিপাথরে নির্মিত। খিলানে হেলান দিয়ে বসে ভিক্ষুগণ উপাসনায় রত আছেন। প্রবেশপথের বাম দিকে একটি টানা একতলা দালান আছে। সেখানে ছোট ছোট ঘর, তিব্বতী গুম্ফা স্টাইলে।
মন্দিরে প্রবেশকালে নজর কাড়ে বুদ্ধের দীর্ঘ ভূমিস্পর্শ সোনালি মূর্তিটি। চোখ নিমীলিত, মুখে মায়া। সোনালি কাপড় দিয়ে তাঁর শরীর মোড়ানো। এ-মন্দিরটি তৈরি হয় ষষ্ঠ শতকে, শিলাদিত্য হর্ষবর্ধনের সময়কালে। কাছাকাছি সময়ে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ভারতবর্ষ ভ্রমণে আসেন। মন্দিরের দক্ষিণ দেয়াল লাগোয়া স্থানে বোধিবৃক্ষতলের বজ্রাসনটি।
শাক্যবংশীয় রাজপুত্র গৌতম, অন্য নামে সিদ্ধার্থ, ২৯ বছর বয়সে প্রাসাদ ছেড়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেরিয়ে পরেন আলোর সন্ধানে। মগধ রাজ্যের পাহাড়ঘেরা গয়া অঞ্চলে এসে তিনি কঠোর সাধনায় মগ্ন হন। পুরো ছয় বছর এ-সাধনা চলে। তাঁর চামড়া ভেদ করে হাড় বেরিয়ে আসে। দৈববলে জানতে পান তাঁকে মধ্যম-পন্থা নিতে হবে, তাঁর আহার প্রয়োজন। তিনি নিরঞ্জনা নদীতে নেমে এসে স্নান করেন। তারপর উরুবেলার এক বৃক্ষের তলে গিয়ে বসেন। সেখানে সুজাতা নামের একজন গৃহিণী তাঁকে পায়েসান্ন পরিবেশন করেন। পায়েস খেয়ে নদী পার হতে গিয়ে তিনি তাঁর ভিক্ষাপাত্রটি ভাসিয়ে দেন স্রোতের বিপরীতে। এই বোধিবৃক্ষের, বস্তুত অশ্বত্থ বৃক্ষের তলে এসে বসেন বজ্রাসনে। লোভ, কামের অপশক্তি মার তার তিন কন্যা রতি, আরতি ও তৃষ্ণাকে প্রেরণ করে গৌতমের ধ্যানভঙ্গের জন্য। ধরিত্রীর প্রবল প্রতাপে তারা সফল না হয়ে মিলিয়ে যায় অদৃশ্যে।

বোধিবৃক্ষের তলে বৈশাখি পূর্ণিমার প্রথম প্রহরে বুদ্ধ লাভ করেন জাতিস্মর জ্ঞান, দ্বিতীয় প্রহরে দিব্যচক্ষু জ্ঞান এবং শেষ প্রহর বা যামে লাভ করেন আসবক্ষয় জ্ঞান বা তৃষ্ণা নিরোধ জ্ঞান, অর্থাৎ বুদ্ধত্ব। তৃষ্ণা নিরোধের মধ্য দিয়ে তিনি জন্ম রোধ করলেন। বিষয়টি এমন যে গাড়ি, বাড়ি, সম্মান, ক্ষমতার লোভই হল তৃষ্ণা। এর কারণে ধরায় বারবার জন্মগ্রহণ করতে হয় এবং দুঃখ ভোগ করতে হয়। তৃষ্ণারোধ ফলাফলে জন্মরোধ হলো নির্বান লাভ করা। বুদ্ধত্ব লাভের পর বুদ্ধ ৭ দিন করে ৭ সপ্তাহ বা ৪৯ দিন একাগ্র ধ্যান করেছেন। কোনোবারে বোধিবৃক্ষের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যে, তোমার তলেই আমি বুদ্ধ হলাম—তিনি নির্ণিমেষ তাকিয়ে ছিলেন বৃক্ষের পানে। কোনোবারে পুরো সপ্তাহ হেঁটে হেঁটে ধ্যান করেছেন।
মন্দিরের দক্ষিণে মুচলিন্দ হ্রদে ষষ্ঠতম সপ্তাহে ধ্যান করেছেন। এ-হ্রদটি টলটলে পানিসহ বর্তমান রয়েছে এবং তার মধ্যিখানে একটি নাগরাজের ফনার তলে বুদ্ধমূর্তিও রয়েছে। বৃক্ষতলের বজ্রাসনটি নির্মাণ করেছিলেন সম্রাট অশোক। বোধিবৃক্ষ যেন কেউ ধ্বংস না করতে পারে তাই চারটি রেলিং দিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এখানে অন্তত তিনটি বিহার প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাঙ দুজনের ভ্রমণ-কাহিনীতে এসব বিহার ও মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। মন্দিরের পশ্চাৎভাগে রয়েছে অনেক চৈত্য। তার ফাঁকে ফাঁকে লাল কাপড়পরা তিব্বতী সাধুরা সকাল-সন্ধ্যা ষাষ্ঠাঙ্গ প্রণামে রত থাকেন। ফুলে, সবুজ ঘাসে, পুরনো স্থাপনায় সমৃদ্ধ এ-মন্দির প্রাঙ্গণ অতি মনোহর।
কঠিন চীবরদান উপলক্ষে নভেম্বর মাসে বুদ্ধগয়ায় জাপান, তিব্বত, শ্রীলংকা, চীন, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও অনেক দেশ থেকে দলে দলে যাত্রীরা আসেন। সুর করে মন্ত্র পড়তে পড়তে তাঁরা মন্দির পরিক্রমণ করেন। বোধিবৃক্ষে চীবরদান করে, বৃক্ষতলে সংঘদান করে, বজ্রাসন দর্শন করে এবং উপস্থিত ভক্তদের কমলা, আপেল, বিস্কুটসহ নানান রকম খাদ্যদ্রব্য দান করে। প্রশান্ত আনন্দলাভ হয় ভক্তদের। ষষ্ঠ শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ বুদ্ধগয়া দর্শন করে বন ও গিরির মধ্য দিয়ে রাজগীরে গিয়েছিলেন। দুই রাত কাটিয়ে আমরাও যাত্রা করলাম বিম্বিসারের রাজধানী রাজগীরে। সঙ্গে নিলাম বরসম্বোধি ভিক্ষুর তীর্থ পরিক্রমা এবং ফার্মা কে.এল.এম প্রকাশিত ‘ফা হিয়েনের দেখা ভারত’ বই দুটি।