চড়কের ঘূর্ণিপাকে
লেখাঃ মাহবুব আলম পল্লব
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩সেই কোন আমলের কথা। অত কিছু কারই-বা মনে থাকে। কাঁঠালিয়ার সাধন সরকার কিছু মনে রেখেছেন, “আমি তো আর দেখি নি, বাপ-দাদার কাছে শুনেছি। সেই ত্রেতা যুগের কথা। তখন বাণরাজা ছিলেন। তিনি শক্তি চেয়েছিলেন, তাই পিঠে বড়শি বিঁধিয়ে মহাদেবকে তুষ্ট করেছিলেন। সেই থেকে এই চল। চৈত্র মাসের শেষ সাত দিন ধরে এই চৈত্র-সংক্রান্তি পরব হয়। মানুষ আনন্দ করে, রোগ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করে। বাপ-দাদাদের করতে দেখেছি, আমরাও করি।”

গৌতম টেলিফোনে ময়মনসিংহের স্নেহাশীষ চৌধুরীর কথা বলে দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, চড়কের সঙ্গে চাকা’র যোগ থাকতে পারে। আর্যরা আসার পর থেকেই এই উৎসব চালু হওয়ার সম্ভাবনা দেখি। হাসনাত আব্দুল হাই-এর নন্দনতত্ত্ব বইতে পেয়েছি, দ্রাবিড়রা মাতৃ ও লিঙ্গপূজা করত। ভোলাগিরি আশ্রমের শিবশংকর চক্রবর্ত্তী মশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে ভালো জ্ঞান হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, নারী হলো গিয়ে শক্তি। অসূরবধ কারা করেছে? মহিষাসুর বধ করেছে দুর্গা, নিমাই করেছে কালী। নারী থেকেই তো পুরুষ হয়। সেইসব দিনের মানুষ তাই আগে থেকে নারী-বন্দনা শুরু করেছিল। চড়কে মহাদেবের সঙ্গে কালীকেও রাখতে হয়। নইলে শক্তি আসবে না।

ধারণা করেছিলাম, চড়কের সঙ্গে উৎপাদনের নিবিড় যোগ রয়েছে। সব লোকায়ত সংস্কৃতিরই উৎপাদনের সঙ্গে যোগ থাকার কথা। যারা প্রকৃতি থেকে আহরণ করে তারা প্রতিদান হিসাবে প্রকৃতিকে বন্দনাও করে। তার নানা রূপ রয়েছে, যেমন ব্রত-আচার। ফসল বোনার আগে, মাঝে, শেষে এবং যখন ফসল করার সময় না, তখনও এই দেশে নানা আচার-অনুষ্ঠান। তাই বাংলাদেশ বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ। কৃষির মাধ্যমেই এখানে প্রকৃত উৎপাদন সাধিত হয়। কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকে কামার, কুমারসহ আরও কত কত জনগোষ্টী। তাই তারা নিজেদের জন্য অনেক উৎসবের উদ্ভব ঘটিয়েছে।

দেব-দেবীরা তাদের নিজেদের কাছে জংলা-কালী, ছেঁচড়া কালী, ব্যোম ব্যোম ভোলানাথ এবং আরও কত! এখানে উচ্চবর্ণের মানুষের প্রয়োজন নেই। নিজেরা মন্ত্র বোনে এবং আওড়ায়। দূর্বা, লতাপাতা, বাড়ির গাছের ফল, গোয়ালের দুধ আর মাটির ঘট—এই নিয়ে পূজার উপকরণ। এসব বাইরে থেকে তাদের জোগাড় করতে হয় না। সারাবছর ধরে ঘরে ঘরে এসব সংরক্ষিত হয় এবং প্রয়োজনের দিন তা দেবতাকে উপহার দেওয়া হয়। এসব পার্বণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় সুর, ছন্দ, তাল, ভঙ্গি, অনুভব।

সাইমন জাকারিয়ার ‘প্রণমহি বঙ্গমাতা’ পড়ে জানলাম মির্জাপুর থানার নগরভাত, সরিষাদাইড়, শেহরাতৈল এলাকায় জমজমাট চড়ক হয়। তাই ভারতেশ্বরী হোমস-এর সুলতানা আপার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি শিল্পী হুমায়ূন ভাইকে সঙ্গে লাগিয়ে দিলেন। হুমায়ূন ভাই চৈত্র মাসের শেষ সাত দিনের তালিকা পাঠিয়ে দিলেন। পিঠে বড়শি ফুঁড়ানো পরিমল সরকার এ-তালিকা তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন। পরিমল ও তার স্ত্রী সারাবছর মহাদেবকে বাড়িতে রাখেন। নিত্যদিন জবা ও নৈবেদ্য দিয়ে সেবা করেন। আর সংক্রান্তি ও পরবের সময়ে পাড়ার নির্ধারিত বাড়িতে থলি স্থাপন করেন। যেখানে মহাদেবের নীলপাট নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিদিন সকালে নীলপাট নিয়ে সন্ন্যাসীরা মাগনে বেরোয়। চাল-ডাল সংগ্রহ করে। নৃত্য করে। মহাদেবের কাছে দেশ ও দেশের মানত জমা দেয়। একে বলে দেলখাটনা।

দলে আমরা ১০ জন। দুটি ভিডিও ক্যামেরা, তিনটি বেবি লাইট, দুটি রিফ্লেক্টর বোর্ড আমাদের সঙ্গে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের অফিস থেকে দুপুর ১২টায় হুমায়ূনের মাইক্রোবাসে চড়ে আমরা দেড়টা নাগাদ মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালের গেটে পৌঁছলাম। বিকালে শিমুল গাছের তলায় বসে জরিনা খালার চিতই পিঠা খেলাম ধনেপাতা আর সরিষা-ভর্তা দিয়ে। সন্ধ্যায় কাঁঠালিয়া গিয়ে সাধন সরকারের সাক্ষাৎকার নিয়েছি আর মাগন দলের স্নান শ্যুটিং করেছি। সকালে নীলপাট নিয়ে যারা বেরিয়েছিল তারা রাত ৮টা নাগাদ মুন্সিবাড়ির খালে মহাদেবকে স্নান করিয়েছিল।
শ্যুটিং-এর জন্য আলো দরকার। প্রয়োজন কোনো বাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেওয়া। তিনটা বাতি তো কম আলো টানবে না, তাই মুন্সিবাড়ির লোকজন বেশি রাজি হচ্ছিল না। তারা কম আয়ের মানুষ, রিকশা চালিয়ে সংসার চলে। পরে মহাদেবের কাজ বলে ইব্রাহিম মুন্সি তার বউকে রাজি করিয়েছিল। ঘন অন্ধকার ভেদ করে বেবি লাইটের সাদা আলো গিয়ে খালে পড়েছিল। শিবনাথ নামের নীলাভ কালো রঙা লোকটি সেই আলোয় মহাদবেকে স্নান করিয়েছিলেন। মাঝারি বাতাসে কড়ই গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ছিল। আমরা শিহরিত হয়েছিলাম।

পরিমল চন্দ্র সরকারের স্ত্রী কথা বলেন সোজাসাপটা। কথা বলেন পরিষ্কার, “সংক্রান্তির দিনে হর আর পার্বতী মিলিত হন। এই মহামিলন উদযাপনের জন্যই আমাদের এই আয়োজন। চড়ক গাছটা হলো শিবলিঙ্গ আর এর উপরে বসবে একটি কাঠের মাথি—এটি হলো পার্বতীর যোনি। এই দু’য়ের মিলনেই জগতে আনন্দ আসে, ফসল ফলে, রোগ-বালাই ভালো হয়, ব্যবসায় উন্নতি আসে।”
দ্বিতীয় দিন রাতে শেহরাতৈল গিয়েছিলাম সঙ দেখতে। আকাশে সেদিন আধা চাঁদ ছিল। শেওড়া গাছের মাথায় পেত্নি ছিল না। বাতাস ছিল বেশ দোল দোলানো। বংশীর খাল ধরে দেড়-মাইল পায়ে হেঁটে আমরা রাত ১০টা নাগাদ পৌঁছেছিলাম। শ্রীচারণের থলিতে সেদিন তিন মণ চাউলের ভাত রান্না হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে লোক এসেছিল, তারা ডুগনি গান করেছিল এবং সঙ দেখেছিল। সঙ-দলে চারজন বাইদ্যানি প্রথমে এসে বন্দনা গেয়েছিল। তারপর এই সময়, সেই সময় আর আগামি সময় নিয়ে নানান নাটিকা উপস্থাপিত হয়েছিল। উঠানটা ছিল মঞ্চ ; হ্যাজাকের আলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ; বসার জন্য বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল পাটের চট। সঙ্গে ছিল ঝাল-মরিচে মাখা মুড়ি। রাত ৩টায়ও মানুষ হেসেছিল, কেঁদেছিল।

চড়কের সাতদিনে নানা পর্ব থাকে। দেলখাটনা, শিববুড়ি, চইদ্দ মাতাল, কালী হাজরা, গরু-দাগনি, হরগোরি পূজা, বাইশাইলে পূজা, বাইর চালান, মইন আনা—আরও যে কত কিছু! এসবের ঠিক ঠিক সমাপনে পালদের, আঁকিয়েদের বেশ ভূমিকা থাকে। হর-গৌরি দু’জনের একটাই মূর্তি হয়। একপাশে ঘিয়ে রঙের শিব, অন্যপাশে লাল রঙের পাঁচ হাত বিশিষ্ট গৌরি বা পার্বতি বা দুর্গা। কালী হাজরায় মা কালীর মুখোশ লাগে। মাটির ছাঁচের উপর কালো কাগজ সেঁটে কালীর মুখোশ হয়। কাগজের বা রাবারের লাল জিহ্বা থাকে। চোখগুলো বিরাট টানা টানা হয়।
বাইশাইলে হলো মহাদেবের সঙ্গী দেও-দানবের পূজা। সরিষাদাইড়ের উত্তর পাড়ার দীপ্তি বলেছিল, চৈত্র মাসে দেও-দানবরা পৃথিবীতে চলে আসে তাই পূজা দিয়ে তাদের যথাস্থানে ফেরত পাঠানো হয়। নয়তো সামনের বছর কী ভাল যাবে? বাইশাইলে পূজাতেও ৪/৫ রকমের মুখোশ বানানো হয়। বেদের দল, সঙ দল, চইদ্দ মাতালকে যারা সাজায় তারা বেশি বয়সী নয়। এর মধ্য দিয়ে রং গোলানোর, টেকানোর, শুকানোর কৌশল তাদের জানা হয়ে যায়। এছাড়া বিভিন্ন নকশাও তারা করতে পারে, হাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।

সাত দিনের এ আচার-অনুষ্ঠান শেষ হয় চড়ক-ঘুরানির মধ্য দিয়ে। কুমুদিনী হাসপাতালের পাশের শ্মশানমাঠে পরিমল তার পিঠে চারটি বরশি গেঁথে ২৫ পাক দিয়েছিল। মাথিকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে উত্তর দক্ষিণে বাঁশ লাগানো হয়। বাঁশের একপাশে পরিমল, অন্যপাশে আরেকজন। চড়ক গাছ ঘোরায় মাথুমা ও তার শিষ্যরা। পরিমল লাল সূর্যকে আড়াল করে মহাদেব হয়ে উঁচু থেকে আরও উঁচুতে পাক খায়। সে যে কী অসাধারণ রোমহর্ষক ব্যাপার! তখন ভক্তরা উলুধ্বনি দেয়, পরিমল বাতাসা ছড়ায়। সূর্য নতুন দিন আনতে যায় অস্তাচলে।