রুটির উজবেকিস্তান

লেখাঃ সৈয়দ আখতারুজ্জামান

বুধবার, ১লা জুন, ২০২২

 

উজবেকিস্তানে রুটি ছুরি দিয়ে কাটা হয় না। হাত দিয়ে ছিঁড়ে নেওয়া হয়। রুটির উপর ছুরি বা চাকুর ব্যবহার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হয় না। এমনকি রুটি ছিঁড়ে নেওয়ার পর উল্টো করে প্লেটে রাখাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি দৃষ্টিকটু এবং রুটির প্রতি অবমাননাকর, অসম্মানজনক।

 

মধ্য এশিয়ার দুর্গম ভুখণ্ডে, রাহুল সাংকৃত্যায়ণের বিবরণে মোট পাঁচটি দেশ আছে—উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিস্তান, তুর্কমেনিস্তান আর তাজিকিস্তান। এর মধ্যে সম্প্রতি উজবেকিস্তান বেড়াতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে—নতুন অভিষিক্ত, আধুনিকমনস্ক প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের জন্য পর্যটন দুয়ার খুলে দেওয়ার কারণে। আর অন্য দেশগুলো ভ্রমণে ভিসা পাওয়া বড়ই ঝক্কির। উজবেকিস্তান নানা কারণে ভ্রমণ করা উচিত—তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ উজবেকিস্তানের খাবার। এত বাহারি আর বৈচিত্র্যময় সুস্বাদু খাবার খুব কমই খেয়েছি। শুধু রুটির গল্পই বলে শেষ করা যাবে কিনা কে জানে! 

রুটির উজবেকিস্তান

 

রুটি উজবেকিস্তানে পবিত্র খাদ্য। উজবেকরা বিশ্বাস করে রুটি সৃষ্টিকর্তার এক বিশেষ নিয়ামক। যারা ভালো রুটি বানান, উজবেকিস্তানে তারা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি, শ্রদ্ধার পাত্র। জানা যায়, উজবেকিস্তানে নানান সময়ে যত শাসক এসেছেন তাঁরা নিজেদের সময়কে ইতিহাসে অক্ষয় রাখতে নতুন মুদ্রা চালু করেছেন। কিন্তু পণ্য কেনাবেচার সময় মুদ্রার ব্যবহার অনেক সময়েই হয় নি। পণ্য কেনাবেচায় মুদ্রার বদলে প্রচলিত ছিল রুটি দেওয়া-নেওয়া।


পারিবারিক, সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে আয়োজনে শুভযাত্রায়, শুভ উপলক্ষে, শুভ প্রারম্ভে, এই রুটির ব্যবহার ছিল অনিবার্য। ধরা যাক, যুদ্ধযাত্রায় ঘরের মানুষটি রওয়ানা হচ্ছে। পোশাক পরে তৈরি। রওয়ানা হওয়ার মুহূর্তে প্রিয় মানুষটির মুখে এক টুকরো রুটি ভেঙে পুরে দেওয়া হলো। বিদায়ের পর বাকি রুটিটুকু তুলে রাখা হবে। যতদিন প্রিয় মানুষটি বাড়ি ফিরে না আসে, ততদিন ওই রুটির টুকরো শিকেয় তোলা থাকবে, ওভাবেই।

 

বিয়ের উৎসবে দুটি নতুন প্রাণ একসাথে যাত্রা শুরু করতে চলেছে—বরপক্ষ, কনেপক্ষ রুটি ভেঙে একে অপরকে খাইয়ে নবদম্পতির মঙ্গল কামনা করল, যেন তারা সুখে থাকে আজীবন। কিংবা বাড়িতে নতুন অতিথি অথবা ফসল কাটার উৎসব, নতুন কিছুর উদ্বোধন, কোনো সাফল্যের উদযাপন সব কিছুতেই রুটি এক শুভকামনার বাহন।

রুটির উজবেকিস্তান

 

রুটি উজবেকিস্তানের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অংশ এবং একটি পরিপূর্ণ সুষম খাদ্য। রুটির সাথে শুধু এক কাপ চা হলেই যথেষ্ট। উজবেকিস্তানে এই চা মানে গ্রিন টি। কোথাও দুধ চায়ের বালাই নেই। সকাল দুপুর রাতে যেকোনো খাবারের আগে এক পেয়ালা গ্রিন টি যেন বাধ্যতামূলক। আর খাবারের মাঝে বা শেষেও আরো এক দু’বার গ্রিন টি খাওয়া হচ্ছে। এ দিয়েই সকালের নাস্তা, লাঞ্চের অ্যাপিটাইজার, ডিনারের ডেজার্ট সব কূল রক্ষা করা সম্ভব।

 

মোদ্দা কথায় আমাদের উজবেক বন্ধু আলী শের ভাই সব বোঝাতে চাইল—এখানে রুটি থাকলে আর কিছু না হলেও চলবে! কেউ যদি সকালের নাস্তায় একটি মাঝারি আকারের রুটি, চা কিংবা মধু কিংবা পেস্তাবাদাম-আখরোট সহযোগে খেয়ে নেয় তাহলে সারাদিনে আর কিছু না খেলেও দিব্বি চলে যায়। এমনই কুদরত এই রুটির! তার মানে কী মেশানো হয় এ রুটিতে, সে এক রহস্য! 

 

উজবেকিস্তানের তাশখন্দ, খিভা, বুখারা, সমরখন্দসহ অন্যান্য আলাদা আলাদা আকারের, প্রকৃতির, রঙের, গন্ধের, স্বাদের, গঠনের, ডিজাইনের রুটি আছে। মোট কত ধরনের রুটি তার হিসেব নেই। প্রধানত দুই রকম। ওবি নান আর পাতির নান। ওবি নান নিত্যখাবারের তালিকায় থাকে, আর পাতির নান মূলত উৎসবের জন্য তৈরি হয়। নানের উপরে নকশা আঁকার জন্য নানা রকমের ছাঁচ ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে ‘চেকিস’ বলে। বলা হয়, প্রত্যেক গাঁয়ের সব বাড়িতেই রুটি বানানোর আলাদা আলাদা ঢং ও স্বাতন্ত্র্য আছে।

রুটির উজবেকিস্তান

এত শত রকমের রুটি থাকা সত্ত্বেও সমরখন্দের রুটিই উজবেকস্তিানের সেরা রুটি ধরা হয়। বিশেষ করে গালা-ওসেগি রুটিকে। সমরখন্দের কাছেই গালা-ওসেগি গ্রামে এই রুটির জন্মস্থান, বিস্তৃতি। এ গ্রামের প্রাচীন কারিগররাই জানেন কী করে এই সুস্বাদু রুটি বানাতে হয়। তারপর থেকেই এর চাহিদা ছড়িয়ে পড়েছে সমরখন্দের প্রতিটি ঘরে এবং সেখান থেকে উজবেকিস্তানের আনাচেকানাচে। একটি খাঁটি গালা-ওসেগি রুটি একটানা তিন বছর খাবার উপযোগী থাকতে পারে।

 

এই রুটির রেসিপি সবার জানা থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত সেই কারিগরদের মতো হুবহু সেই স্বাদ-গন্ধের রুটি আর কেউ কোথাও বানাতে পারে নি। অনেক চেষ্টা করেও কেউ নকল করতে পারে নি। এমনকি কারিগররা নিজেরাও পারেন নি। সমরখন্দ ছেড়ে অন্য কোথাও গেলেই এই রুটি আর অবিকল আগের মতো থাকে না। কিছু না কিছু বিগড়ে যায়। এই নিয়ে একটা সত্য কাহিনীও আছে।

 

একবার বোখারার আমির সমরখন্দের এই রুটি খেয়ে এতই তৃপ্ত হলেন যে, তিনি হুকুম দিলেন এখন থেকে প্রতিদিন সকালে যেন তার দস্তরখানায় এই রুটিই পরিবেশন করা হয়। সমরখন্দের সেরা কারিগরকে বোখারায় ডাকা হলো। কারগিরের নির্দেশনামতো গম, আটা, ময়দা, ঘি, ডিম, বাদাম, চিনি, পেস্তা, ফল, মসলাসহ যা যা প্রয়োজন সব আয়োজন করা হলো। যথাসময়ে রুটি বানানো হলো। সকালের নাস্তায় আমিরের টেবিলে পরিবেশন করা হলো।

রুটির উজবেকিস্তান

 

আমির রুটি মুখে দিয়েই বুঝতে পারলেন এই রুটি সমরখন্দের সেই রুটি নয়। আমির বিরক্ত হলেন। সবাই মহাচিন্তায় পড়ে গেল। কারিগর অনুমান করল, হয়ত সমরখন্দের জল মেশানো হয় নি তাই স্বাদ ঠিক হয় নি। দ্রুত সমরখন্দ থেকে জল আনা হলো। পরদিন আরও সতর্কতার সঙ্গে আরও যত্ন নিয়ে রুটি বানানো হলো। আমিরকে পরিবেশন করা হলো কিন্তু ফলাফল তথৈবচ। কোনো লাভ হলো না।

 

আমির সেই যে মুখে লেগে থাকা স্বাদ আর কিছুতেই পাচ্ছেন না। রেগেমেগে আগুন হয়ে গেলেন বোখারার আমির। কারিগর তো ভয়ে কাঁপছে। সবাই তাজ্জব বনে গেলো। কিছুতেই ব্যাখ্যা মেলে না। সেই একই কারিগর, একই উপাদান, সবই এক, তাহলে রুটির স্বাদ একই রকম হচ্ছে না কেন? নিশ্চয়ই ব্যাটা কারিগরের কোনো ষড়যন্ত্র! উত্তেজিত আমির সেই রুটি কারিগরের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন। আদেশ শুনে কারিগরের চেহার রক্তশূন্য!

 

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে আমির কারিগরকে শেষবারের মতো ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “বলো, কী লুকিয়েছিলে রুটিতে যার জন্যে ঠিক সমরখন্দের রুটির মতো হলো না?”

কারিগর কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, “হুজুর, সমরখন্দের বাতাস ছাড়া এ রুটি হবে না।”

আমির গভীরভাবে বিষয়টা ভাবলেন। তারপর বললেন, “এ যাত্রা তুমি বেঁচে গেলে কারিগর! এর চেয়ে ভালো যুক্তি আর হয় না।”

তারপর থেকে সমরখন্দের রুটি আর সমরখন্দের বাইরে কেউ আজও বানাতে পারল না। তাই আপনি যদি একটি খাঁটি গালা-ওসেগি রুটি ট্রাই করতে চান তাহলে আপনাকে সমরখন্দ ভ্রমণে আসতেই হবে।


মাটির চুলার গনগনে কাঠের আগুনের ভেতর তন্দুরি রুটি যে আঁচে তৈরি হয়, পাঁচ হাজার বছর ধরে সেই একই চুল্লির আগুনে শত শত বিভিন্ন ধরনের রুটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম হাজারো বৈচিত্র্যময়তায় তৈরি হয়ে আজও পৃথিবীর বিস্ময়কে বিস্ময়তর করে রেখেছে।