জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন

লেখাঃ উদয় শংকর বিশ্বাস

শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩

 

অনেক দিন থেকেই মনটা চাইছিল কোথাও থেকে বেরিয়ে আসতে। মন চাইলেই কি আর সব সময় তা করা যায়; সাংসারিক দায়িত্ব, কর্মের টান মনকে দমিয়ে দেয় বারংবার। আর এই সবকিছু প্রাত্যহিক জীবনকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে তা ছিন্ন করে বেরিয়ে পড়া খুব সহজ নয়। তাই সাপ্তাহিক অবসরের এক শুক্রবারে সব বাধা অতিক্রম করে মনকে বাগে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি—দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন লালন করে চলা—দেশের প্রাচীন এক জনপদ দর্শনে। উঁ-হু, আগে থেকে বলব না আজ কোথায় যাব।

জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন

ঢাকার বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে যাই কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে। এখান থেকে ছাড়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের সব গাড়ি। রাজশাহীগামী ন্যাশনাল ট্রাভেলসের সকাল আটটার টিকিট কেটে তাতে চড়ে বসি। বাস ছাড়ল খানিকটা সময় নিয়ে প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ। এটি ঘণ্টা-তিনেক চলার পর টাঙ্গাইল, যমুনা সেতু অতিক্রম করে থামল সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলের ‘ফুড ভিলেজ’ রেস্তোরাঁয়। এখানেই সারলাম সকালের জল-খাবার। বর্জন-গ্রহণ করে আবার উঠে পড়লাম গাড়িতে।

 

গাড়ি এবার এগিয়ে চলল চলনবিলেরর বুক চিরে তৈরি হওয়া হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়ক ধরে। খানিকক্ষণ চলার পর দেখা মিলল চলনবিলের। আঁচ করা গেল এর বিশালতা। বিলে জল কেবল আসা শুরু হয়েছে। বর্ষাকালে চলনবিল যে কি রূপ ধারণ করে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নওগাঁ-নাটোর-পাবনার বিশাল এলাকা জুড়ে দেশের বৃহত্তম এই বিলের অবস্থান। এককালে এই বিল দেশের মিঠাপানির মাছের চাহিদা অধিকাংশই পূরণ করত। বর্তমানে সেই রমরমা ভাবটি নেই।

জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন

উদাসী মনের খবরাখবর নিতে না নিতে সময় হলো নেমে পড়বার। ‘মান্নান নগর’ মোড়ে আমাকে নামিয়ে বাসটি দ্রুত চলে গেল নাটোরের পানে। মোড়টি হাইওয়ের উপরে দু’দিকের রাস্তার সংযোগস্থলে অবস্থিত। পশ্চিম দিকের রাস্তাটি চলে গেছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশের দিকে, আর পূর্বের রাস্তাটি গিয়েছে পাবনার চাটমোহর থানার ইতিহাসখ্যাত হান্ডিয়ালের দিকে। আমার গন্তব্য কালো পিচের সর্পিল দ্বিতীয় পথটি। আমাকে অল্প কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো আমজনতার শকট-ভ্যানের জন্য। আমিসহ জনাচারেক যাত্রী নিয়ে ভ্যানখানা রওনা হলো হান্ডিয়ালের দিকে। জনপ্রতি ভাড়া দশ টাকা। মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে গেলাম হান্ডিয়াল বাজারে। 

 

যাত্রাপথের ক্লান্তি দূর করার অভিলাষে আশ্রয় নিলাম অপরিচিত এক চায়ের দোকানে। নির্দেশ-মাফিক অল্প চিনি সহযোগে গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে প্রস্তুতকৃত চা পান করে, রওনা হলাম বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত কাঙ্ক্ষিত ‘শেঠের বাংলা মন্দির’ দেখতে। একবাংলা রীতির এই মন্দিরটি অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে তৈরি। গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ‘বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তি’ গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম জানতে পারি এই মন্দিরটির কথা। এটি দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক দিনের। প্রথম দর্শনেই অভিভূত হয়ে যাই এর স্থাপত্যশৈলী ও অলংকরণে।

জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন

বাংলাদেশে টেরাকোটা-সমৃদ্ধ যতগুলো মন্দির আজতক প্রকৃতি ও মানুষের অত্যাচার সহ্য করে টিকে আছে তার মধ্যে এটির অবস্থা অনেক ভালো। স্থানীয়দের অপরিসীম অবহেলা সহ্য করে আজও এটি জানান দিচ্ছে এর অতীত গৌরবকে। ছোট্ট এই মন্দিরটির দৈর্ঘ্য নয় ফুট ও প্রস্থ প্রায় সাড়ে সাত ফুট। এটির উচ্চতা প্রায় ফুট দশেক। এর চার কোণে চারটি টারেট আছে, যা টেরাকোটা দিয়ে আচ্ছাদিত। মন্দিরের সম্মুখভাগের পুরোটাই সাজানো দেবদেবী ও গার্হস্থ্য জীবনের চিত্রাবলী সম্বলিত অসংখ্য টেরাকোটা দিয়ে। মন্দিরের গায়ের টেরালিপি পাঠে জানা যায়, ১৭০১ শকাব্দে অর্থাৎ ১৭৭৯ সালে জনৈক ব্রজরাম দাসের পুত্র দেবতার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করেছিলেন।

 

বাংলাদেশের দোচালা ঘরের অনুকরণে বাংলার নিজস্ব বাস্তুশিল্প মেনেই এটি নির্মিত হয়েছিল। এ-ধরনের মন্দিরের অস্তিত্ব বর্তমানে খুব একটা নেই। যে কয়েকটা আছে তার মধ্যে এটির অবস্থা সবচেয়ে ভালো। বিশিষ্ট মন্দির-গবেষক ডেভিড ম্যাকাচ্চন তার ভ্রমণ-কাহিনীতে মন্দিরটিকে বাংলার সবচেয়ে সুন্দর একচালা মন্দিরের মর্যাদা দিয়েছিলেন মূলত এর সৌন্দর্য দেখে। এর গায়ে কালীমাতার একটি টেরাকোটার উপস্থিতি দেখে আমরা অনুমান করতে পারি, সম্ভবত মন্দিরটি শাক্ত ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অনেক দিন ধরেই এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। টেরাকোটার অধিকাংশই বিবর্ণ হয়ে গেছে, শ্যাওলা জমায় এর আসল সৌন্দর্যকে আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরেও বুঝে নিতে কষ্ট হয় না যৌবনে এটি কতটাই না সুন্দর ছিল!

জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন

‘শেঠের বাংলা মন্দির’ দেখে পার্শ্ববর্তী ইটের রাস্তা অনুসরণ করে পায়ে হেঁটে পূর্ব দিকের পথ ধরে খানিকটা এগোলাম। এখানে আছে আরেকটি পুরাকীর্তি, যা ‘জগন্নাথ দেবের মন্দির’ নামে সকলের কাছে পরিচিত। বাংলাদেশের প্রাচীনতম মন্দিরের মধ্যে এটি অন্যতম। মন্দিরের প্রবেশ পথের বাম পাশে আছে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের স্নানগৃহ। ঘরটি যে হাল আমলে সংস্কার করা হয়েছে তা বোঝা যায় এর গায়ে শুভ্র টাইলসের ব্যবহার দেখে। মন্দির-প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে হয় নগ্ন পায়ে। হাতে পাদুকা নিয়ে এগিয়ে গেলাম মূল মন্দিরের কাছে। মন্দিরটি রেখা-রীতিতে তৈরি। গোড়া থেকে ক্রমশ সরু হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। চূড়াতে একসময়ে পিতলের ঘট ছিল। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এর ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার সংস্কার করায় আদি বৈশিষ্ট্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

 

মূল মন্দিরটি অনুচ্চ বেদীর উপরে অবস্থিত। পুরো মন্দিরটাই ইট দিয়ে তৈরি। সামনের দিকে একটিমাত্র দরজা বা প্রবেশপথ আছে। প্রবেশ পথের উপরিভাগ থেকেই খাঁজ শুরু হয়েছে, যা ক্রমশঃ উপরে উঠে চূড়ায় গিয়ে শেষ হয়েছে। এককালে সমগ্র মন্দিরেই টেরাকোটার উপস্থিতি ছিল। এখন অবশ্য তেমন একটা নেই, দরজার দু’পাশ ছাড়া। একসময়ে যে এটি দেখতে খুব সুন্দর ছিল সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, বিশেষ করে এর গায়ে এখনো যেসব অলংকরণ আছে তা যে-কাউকে মুগ্ধ করতে পারে। মন্দিরের প্রবেশ পথের বাম পাশে একটি শিলালিপি আছে। এই লিপি পাঠে জানা যায়, ১৫১২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৫৯০ সালে ভবানী প্রসাদ কর্তৃক এটি পুনঃসংস্কার করা হয়েছিল। তাই যদি হয় তাহলে একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, মন্দিরটি এরও অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত। তবে ঠিক কত আগে সে কথা সুর্নিদিষ্ট করে বলার মতো কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ আজ আর অবশিষ্ট নেই।

জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন

মন্দিরে জগন্নাথ দেবের যে-বিগ্রহ আছে তা শিল্পবোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও যথেষ্ট ভালো লাগায়। এত সুন্দর জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ দেশে খুব কম আছে। এখানে নিত্যপূজা ও অন্ন-ভোগ দেওয়া হয়। এর জন্য বংশানুক্রমিক ব্রাহ্মণ আছেন। এঁদের তত্ত্বাবধানে থাকায় অন্যান্য মন্দির থেকে এর অবস্থা অনেকটা ভালো। প্রতি বছর রথযাত্রার সময়ে হাজার-হাজার পূণ্যার্থী এখানে আসেন তাঁদের মনস্কামনা পূরণের অভিলাষে। ভক্তদের পদভারে তখন মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মন্দির-প্রাঙ্গণ। সেসময়ে এখানে বসে বিশাল রথের মেলা। মেলা মন্দির-প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে বাজারের বিভিন্ন প্রান্তে। রথযাত্রার আগে এখানে অনুষ্ঠিত হয জগন্নাথ দেবের স্নান-উৎসব। আষাঢ়ী এই উৎসবে সামিল হন স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর থেকে আসা জগন্নাথের অনুসারী অসংখ্য নারী-পুরুষ।

 

পুরাতন মন্দিরের পাশে দক্ষিণ দিকে বড় আকারের আর একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকলেও মন্দিরের তেমন কোনও উন্নয়ন হয় নি। মন-প্রাণ ভরে সারা দুপুর জুড়ে দেখলাম এর নির্মাণ কৌশল, উদ্ধার করার চেষ্টা করলাম কিংবদন্তীর আড়ালে সত্য কথনকে। আর এভাবে কখন যে সময় গড়িয়ে পড়ল বিকেলের পানে, তা টেরই পেলাম না। মাঝে মন্দির পুরোহিতের আহ্বানে দ্বি-প্রহরে আহার সারলাম। নিরামিষ এই খাবারের স্বাদ অতুলনীয়।

জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন

ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এল মনের অজান্তে। মন আসতেই চাইছিল না এখান থেকে। মনকে প্রবোধ দিয়ে উঠে পড়লাম। বিকেলের উদাস আবহাওয়া মনের আবহাওয়াকে আরও বেশি প্রভাবিত করলো। স্নিগ্ধ-শান্ত-মায়াবী এই পরিবেশ ছেড়ে পুনরায় রওনা দিলাম ঢাকার পানে। তবে মন্দির ছেড়ে আসার প্রাক্কালে যে-স্বর্গীয় অনুভূতি অনুভব করলাম তা আমাকে আবার অহ্বান জানাল এখানে পুনরায় আসার।

 

জোড়া মন্দিরের সান্নিধ্যে এক দিন


 

কিভাবে যাবেন : কল্যাণপুর-গাবতলী থেকে নাটোর-রাজশাহীগামী ন্যাশনাল ট্রাভেলস, শ্যামলী, হানিফ, মর্ডানসহ যেকোনো পরিবহনে যাত্রা করে নামতে হবে হাটিকুমরুল-বনপাড়ার মাঝামাঝি ‘মান্নান নগর’ মোড়ে। ভাড়া এসি ৪৫০ টাকা, নন-এসি ২৫০ টাকা। এখান থেকে রিকশাভ্যানে অথবা নছিমনে সহজেই পৌঁছানো যায় হাণ্ডিয়াল বাজারে। ভাড়া ১০-১৫ টাকা। ফিরতি পথ ঐ একই। দিন-রাত সবসময় মান্নান নগর থেকে ঢাকামুখী গাড়ি পাওয়া যাবে। খাবারের জন্য হাণ্ডিয়াল বাজারে দোকান আছে।