পাবলাখালী কত দূর
লেখাঃ শাহীন আহমেদ
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩
কাপ্তাই লেকভর্তি পানি আর পানি। মাথার উপর খোলা আকাশ, সামনে উঁচু পাহাড়। ট্রলারের উপর বসে আমাদের ভ্রমণদলের সঙ্গী ওয়াকিল ভাই গান ধরেছেন—আমার মন না চায় এ ঘর বাঁধি লো কিশোরি...। আমরা তার সঙ্গে গলা মেলাই। যাচ্ছি পাবলাখালী অভয়ারণ্যে। রাঙামাটি শহর থেকে ১১২ কিলোমিটার দূরে অনন্য জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই বনের আয়তন ৪২ হাজার ৮৭ হেক্টর। উচ্চতা কোথাও ১০০, কোথাও ৩০০ মিটার। একসময়ে পেছনে মিলিয়ে যায় রাঙামাটি শহর। দুই পাশে পাহাড় রেখে বড় একটা খাল ধরে এগোই। শুভলং ঝরনা দেখি, দীর্ঘ বাঁশের ভেলা দেখি, পাল তোলা নৌকা দেখি, পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখি। লংগদু বাজারে এসে দুপুরের খাবার খাই। তারপর যাই মাইনিমুখ। এরপরও পথ শেষ হয় না। শুধাই, ‘পাবলাখালী কত দূর?’ ‘দূর আছে। চুপচাপ বসেন।’

আমরা আমতলি ঘাটে এসে থামি। থাকার এবং খাবার ব্যবস্থা করার জন্য দলের সদস্য মাহি, হাসিবসহ কয়েকজন উপরে যায়। গিয়ে আর আসে না। আমাদের অন্ধকার ঘিরে ধরে। মশার উৎপাত বাড়ে। দলনেতা গণি ভাই বলেন, নেমে দেখবেন নাকি? আমি রিফাত ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোই। গিয়ে দেখি মানুষের জটলা। উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় চলছে। জটলায় মাহি নেই, হাসিব আছে। পুলিশ দেখে বুঝলাম—‘ডালমে কুচ কালা হ্যায়!’ পাহাড়ে আগেও এমন হয়েছে। মনে পড়ে যায়, রোয়াংছড়ি যাওয়ার পথে পুলিশ আমাদের জিপ থেকে নামিয়ে লরিতে তুলে দেয়। বাপরে বাপ! তাই বিড়ালের মতো মিউ মিউ করে সালাম জানালাম। রিফাত ভাইও তাঁর লম্বা মাথা কিছুটা নোয়ালেন। দারোগাবাবু খেঁকিয়ে উঠলেন—“বিনা পারমিশনে কীভাবে এলেন, সঙ্গে আবার মেয়েছেলে! জানেন এখানে কী আছে?”
এক নিঃশ্বাসে হাতি-ঘোড়া সব দেখিয়ে দিলেন। বিনয়ে গলে গিয়ে বললাম, “বিলকুল ভুল হয়ে গেছে। এখন আপনি যা বলেন।” তিনি বললেন, “রাতে এখানে থাকুন। রেস্টহাউজ আছে। সকালে সূর্য ওঠার আগে এলাকা ছাড়বেন। সোজা রাঙামাটি।” আমরা মাথা ঝাঁকিয়ে, শরীর দুলিয়ে বললাম, ‘অবশ্যই, অবশ্যই।’ এবার মাহিকে দেখতে পাই। সে বাজারে গিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করে এল। দারোগাবাবু কনস্টেবল কামাল ও রেস্টহাউজের কেয়ারটেকার সামছুকে ডাকেন। কামাল তার বন্দুক উঁচিয়ে বলে, ইয়েস স্যার। “ঢাকার মেহমান, খেয়াল রেখ, রাতে ক্যাম্পে এসো”। এ-কথা বলে দারোগা চলে গেলেন। বুঝলাম তিনি ফেউ লাগিয়ে দিয়েছেন। আমরা ট্রলারে ফিরে আসি। ঘটনা শুনে গণি ভাই বলেন, ‘দেখা যাক’।

বনস্মৃতি রেস্টহাউজ দেখে পথের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আমরা সাফসুতরো হই। তারপর ছুট লাগাই বাজারের দিকে। মনিরের রেস্টুরেন্টে খাবারের ব্যবস্থা। চমৎকার রান্না। আকাশ ভেঙে জ্যোৎস্না নেমেছে থোকায় থোকায়, দলে দলে! চাঁদের আলোয় আমরা হাত ধরাধরি করে নাচি। ওয়াকিল ভাই গান ধরেন। আমরা হাসি-খেলায় ভেসে যাই। পরদিন সকালে নাস্তার পর আবার পুলিশের মুখোমুখি। ফের নিষেধাজ্ঞা জারি। আমরা ‘ঠিক আছে’ বলার মতো কিছু একটা বলি আর মনের কথা মনে লুকিয়ে রাখি। দুপুরে খাওয়ার পর বুকে সাহস জমিয়ে জঙ্গলের পথ ধরি।
শুরুতেই একটা কাঠের পুল। নিচ দিয়ে বয়ে গেছে ছড়া। দুপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। সরু রাস্তায় লাইন দিয়ে হাঁটতে থাকি। ভয় আছে, যেকোনো সময়ে মত্ত হাতি নেমে আসতে পারে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসতে পেরেছি। নিজেদের বিজয়ী লাগছে। এখানকার সবচেয়ে উঁচু রাঙা পাহাড়ের পাশে ছোট এক বাজারে জিরোতে বসি। গরম গরম তেলের পিঠা খাই। পরিচয় হয় প্যারাছড়া চাকমাপল্লীর কারবারি অমূল্য রতন চাকমার সঙ্গে। বাকি পথের দিশা তাঁর হাতে। অমূল্যদা একটি পাহাড়ি ঝিরিপথে নিয়ে গেলেন। শুরুতেই গভীর খাদ। পিচ্ছিল পথ। ঝিরির এক জায়গায় গিয়ে দেখি গভীর অন্ধকার। জ্বলে ওঠে হেডলাইট, টর্চ। পা ফেলি সাবধানে। কিছুদূর গিয়ে একসময়ে অমূল্যদা বললেন, এবার উঠুন। হঠাৎ দেখি পথ উঠেছে পাহাড়ে। সোজা খাড়া।

অমূল্যদা দুহাত দিয়ে গাছ ঠেলে পথ করে নিচ্ছেন—আমরা তাঁর পিছু ছুটছি। এক দল বেশি এগিয়ে গেলে পেছনের দল রাস্তা হারিয়ে ফেলে। চেঁচাতে থাকে—রাস্তা কই, কোন দিকে যাব? অমূল্যদা সাড়া দিয়ে পথ দেখান। আমরা এখন এক নিবিড় জঙ্গলে। নাম প্যারাছড়া। যেখানে আলো আর অন্ধকারের ধাক্কাধাক্কি চলে। শেষে আলো জিতে যায়; আমরা পেয়ে যাই এক আরামদায়ক পথ। অমূল্যদা বললেন, “জুতা খুলতে হবে।” দলের কনিষ্ঠ সদস্য মুন ব্যাকুল হয়ে শুধায়—কেন, কেন? অমূল্যদা বিনীত কণ্ঠে বললেন, “সামনে অরণ্য-ভাবনা কুঠির”। আমরা বাক্যব্যয় না করে জুতা খুলে তার পিছু চলতে থাকি। দেখি জঙ্গলের মাঝে একটি ঘর—বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রার্থনাগৃহ।

আমরা ফিরতি পথ ধরি, তবে অন্য রাস্তায়। অন্ধকার নামছে পাহাড়ে। ফিরতে হবে যত তাড়াতাড়ি পারা যায়। হাতিরা আসতে পারে যখন-তখন। আমরা শব্দ না করে লাইন দিয়ে হাঁটি। ফিরে আসি গতকালের রেস্টহাউজে। পুলিশের জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিলাম, কিন্তু এলেন না। রাতের খাবার খেয়ে গল্প, গান সেরে ঘুমাতে গেলাম।