পোখারায় ..
লেখাঃ জাহীদ রেজা নূর
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩কাঠমান্ডু থেকে ট্যুরিস্টবাসে পোখারা সাত ঘণ্টার পথ। পথ মানে শুধু পথ নয়, যেন নিসর্গের সঙ্গে আলাপ করতে করতে এগিয়ে চলা। এই ভোরেই জেগে উঠেছে কাঠমান্ডু। প্রাচীণতার পরশ মেখে আধুনিকতার দিকে তাকিয়ে আছে শহরটা। পুরনো আর নতুনের ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে।
একটা ঢালু পথ পার হওয়ার পরই আমরা যেন চলে এলাম অন্য জগতে। এলিস যেমন বুঝতে পারে নি সে কী করে হাজির হলো ওয়ান্ডারল্যান্ডে; তেমনি আমরাও হঠাৎ দেখি ধুলোমলিন কাঠমান্ডুর জায়গায় এখন আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু, খাড়া-ঢালু এক আশ্চর্য পথ, যার একদিকে সুউচ্চ পাহাড়, অন্যদিকে গিরিখাদ। আর মাঝে মাঝেই বাসের ডানে বা বাঁয়ে এসে হাজির হচ্ছে খরস্রোতা নদী—ত্রিশুলি, কখনওবা মারশিংডি।
বাসেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল সকাল-দুপুরের খাবারের টিকিট। ঘণ্টাদুয়েক চলার পর একটি রেস্তোরাঁয় নাশতার জন্য থামলাম আমরা। বুফে ব্যবস্থা, সবজিরই রকমফের। সঙ্গে মুরগিও আছে। রেস্তোরাঁ লাগোয়া একটি মুদি দোকান। পাহাড়ি এক নারীর হাতে দাঁড়িপাল্লা। চাল-ডালের পাশাপাশি পাহাড়ি পেয়ারা আর নাশপাতিও বিক্রি করছেন তিনি। তখনো আমাদের হাতে নেপালি টাকা নেই। ডলারে কেনা হলো ফল। ডাঁসা কচকচে নাশপাতিগুলো মুখে দিতেই পাওয়া গেল অমৃতের স্বাদ। আর পেয়ারা! সত্যিই, এমন সুস্বাদু পেয়ারার স্বাদ পাই নি অনেক দিন।

আপনি যদি ভ্রমণপিয়াসী হয়ে থাকেন, তাহলে নৈসর্গিক সৌন্দর্য আপনার দুচোখ বন্ধ করতে দেবে না। পাহাড়, নদী আর অরণ্য আপনাকে মোহিত করে তুলবে।
পোখারার বাসস্ট্যান্ডটি ছোট। আমরা যে সময়ে গিয়েছিলাম, সেটা ট্যুরিস্ট-সিজন ছিল না। তাই পর্যটক দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে হোটেলের এজেন্টরা। কার হোটেল কত ভালো আর কত সস্তা, তা বর্ণনা করে যাচ্ছে। আমাদের অবশ্য আগে থেকেই ঠিক করা ছিল ল্যান্ডমার্ক হোটেলে উঠব আমরা। ফেওয়া লেক ঘেঁষেই হোটেল। আমাদের ঠাঁই হলো একদিককার পঞ্চমতলায়, যদিও লিফট নেই। পঞ্চমতলায় বাসযোগ্য দুটো মাত্র রুম। দুটোই আমাদের দখলে। ঘর দুটোর সামনে বিশাল ছাদ। সেখানে আবার দোলনাও আছে। আর সেই ছাদ থেকে সামনের দিকে তাকালেই লেকের ওপর পাহাড়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা মেঘ চোখে পড়বে।
পোখারায় পৌঁছে কোথায় পালাল ক্লান্তি! হোটেলের পাশেই টাকা ভাঙানোর বুথ। অল্পকিছু ডলার ভাঙিয়ে রাস্তার ধারের সারি সারি দোকান পর্যবেক্ষণে বের হই। সমৃদ্ধ বইয়ের দোকন দেখে মন ভরে যায়। দুটি বই কেনাও হয়। নেপালের নাম করা পশমিনা দেখে বিমোহিত হই। পশু-লোম থেকে তৈরি এই চাদর এত হালকা, অথচ কী গরম ধরে রাখে চাদরগুলো! বুদ্ধের কারুকাজ করা কাঠের মূর্তি, মুক্তা, পাথরের মালা, ‘নেপাল’ কিংবা ‘পোখারা’ লেখা টি-শার্ট কতকিছুই না এই বাজারে! আর নেপালি খাবার! খাবার বলতে প্রথমেই মোমো। একটু চাটনি দিয়ে এইমাত্র চুলা থেকে নামানো গরম গরম মোমো খাওয়ার স্বাদ তুলনাহীন!

ফেওয়া লেকে নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ ভোলার নয়। লেকের অন্য পাড়টি পাহাড়ঘেরা। পাহাড় বেয়ে চুইয়ে নামছে জল। আর তরুণ তরুণীরা তাদের নৌকা থাকিয়ে সেখানেই করছে পিকনিক।
পরদিন একটি গাড়িতে পোখারা দেখতে বেরিয়ে পড়ি আমরা। একটা মন্দিরে কিছুটা সময় কাটিয়ে চলে আসি শ্বেতি নদীতে। এটাকে নদী বলব, না গিরিখাদ তা নিয়ে সন্দেহ আছে। একটি সেতুর মতো করে দেওয়া হয়েছে। তার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে দুধসাদা জল। কিন্তু সেই সেতুর রেলিং থেকে নিচের দিকে তাকালে আতঙ্কিত হয়ে উঠতে হয়। গিরিখাদটি দিয়ে বহু নিচে প্রচণ্ড বেগে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী। মনে হলো, ধন্য এ দুচোখ!

এরপর পোখারা জাদুঘর দেখে, রওয়ানা দিলাম ডেভিস ফলস দেখতে। ওপর থেকে নেমে আসা প্রচণ্ড বেগে ধাবমান জলরাশি দেখে পর্যটকেরা মুগ্ধ হয়। দেবী, নাকি ডেভিড, কার নামে এই জলপ্রপাত তা নিয়ে খোদ নেপালেই আছে সংশয়। কে কোন কিংবদন্তিকে বিশ্বাস করবে, সেটা তার নিজের ব্যাপার।
গুপ্তেশ্বর গুহায় ঢোকার আগে বুঝি নি, স্যাঁতসেঁতে এই গুহাটি আমাদের নিয়ে যাবে মাটির ১০০ ফুট তলদেশে! মাথার ওপরে মাটির যে ছাদ, তা থেকে চুইয়ে নামছে পানি। কিছুটা দূর নামার পর বুঝতে পারি, এরকম জায়গায় অনায়াসে ভৌতিক চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব। ৪০ ফুট নামার পর একটি মন্দির দেখি। সেখানে খেলনা কামধেনু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন। সেই কামধেনুর কাছে পয়সা দিলেই দুধের নহর বয়ে যায়।
একসময় উঠে এলাম আমরা। ১০০ ফুট নামার অনুমতি ছিল না সে সময়ে। শীতকালে, মানে এখন গেলে যে কেউ গুপ্তেশ্বর গুহার শেষ পর্যন্ত দেখে আসতে পারবেন।
নাগরকোট যেমন এভারেস্ট দেখার জন্য সবথেকে ভালো জায়গা, পোখারা তেমনি অন্যপূর্ণা দেখার জন্য। ভোররাতেই গাড়িতে করে চলে যাওয়া যায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে। সূর্য ওঠার সময় অপার্থিব এক সোনালি আভা—যখন প্রকৃতি আর মন ছুঁয়ে যায়, তখন সত্যিই মনে প্রশ্ন জাগে, জগতে এত হানাহানি, এত বৈষম্য কেন?
কিছুদিনের জন্য হানাহানিবিহীন নিসর্গের মধ্যে বসবাসের কথা যদি কেউ ভাবেন, তাহলে অনায়াসে বেছে নিতে পারেন পোখারাকে। পাহাড়, অরণ্য ও খরস্রোতা নদী আপনাকে পরিণত করবে নতুন মানুষে।