পার্ক সার্কাস : কোলকাতা ক্রোমোজম
লেখাঃ সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩
ভি.সি.আর.-এর সাদা-কালো যুগে খুব রঙিন রঙিন দৃশ্য থাকত। বিটিভি-তে সপ্তাহান্তে ইংরেজি মুভি, দু’দিন জঙ্গল-বুক। সেই বয়সটা দুমদাম ফুরিয়ে গেলে বইয়ের তলায় লুকনো উপন্যাসের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বিকেলে শরীরচর্চার পাশাপাশি শুরু হয় ছুটির দিনে রুচি তৈরির প্রশিক্ষণ!
এ প্রক্রিয়ায় বাড়িতে ভি.সি.আর-এর পেটমোটা বাক্সের ভেতর প্যাঁচানো ফিতের গায়ে লেপ্টে প্রবেশ করেছিল গুপী গায়েন বাঘা বায়েন, হীরক রাজার দেশে। সেই ধারায় পরিণত সময়ে এলো সত্যজিতের জন অরণ্য, পরশপাথর, মহানগর, অপু-ট্রিলজি। এরপর মৃণাল সেনের কোলকাতা ট্রিলজির গল্প। ইন্টারভিউ, কলকাতা-৭১ আর পদাতিক ছবির মুখ্য চরিত্র তো আসলে কোলকাতা শহরই। আরও খানিকটা বয়স চট করে বেড়ে গেলে তখন ঋত্বিক ঘটকও প্রবেশ করলেন অনায়াসে।
বইয়ের মধ্যে সেই সময়, প্রথম আলো, পার্থিব বা মানব জমিনের মোটা শরীরটা ঠিকই এঁটে গেল সরু বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের তলায়। আর এসব কিছুর ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, মাদার তেরেসা বা সত্যজিৎ রায়ের শহর কোলকাতা কোনোদিন না দেখেও হয়ে উঠল আমাদের ভীষণ পরিচিত। পূর্বসূরিদের মুখে তখনও কোলকাতার ম্যাটিনি শো, হাতে টানা রিকশা, মির্জা গালিব রোডের কাবাব বা হগ সাহেবের নিউমার্কেট থেকে ছিটের ভালো কাপড়ের স্মৃতি উসকে ওঠে। বাবা-কাকা-দাদা’র মুখে চাঁদনী চকের ওয়াছেল মোল্লার দোকানের গল্প। একসময় ওয়াছেল মোল্লার দোকানে নাক-ফুল থেকে ছাতা, তৈজসপত্র থেকে চেয়ার-টেবিল সবই নাকি পাওয়া যেত।

দেশভাগের আগে এক তরুণ সেই দোকান থেকে সদ্য বিবাহিত কিশোরী স্ত্রীর জন্য নাক-ফুল কিনে ট্রেনে উঠেছিল। বিয়ের তিনমাস বাদে বাড়ি ফিরছে, গোয়ালন্দ ঘাটের পাশে স্টেশন। নেমে নৌপথে সি.এন.বি ঘাট দিয়ে নৌকায় ফেরা। নাক-ফুল ছিল পাঞ্জাবির পকেটে, মোড়ানো কাগজে। আলতা, সুগন্ধি তেল, হিমানী আর দুটো শাড়ি নিয়ে ছোট ট্রাঙ্কটা গোয়ালন্দ স্টেশনে হারিয়ে গেল। স্বামীর কেনা সেই বাক্সের জিনিসগুলো নিয়ে আমার দাদিকে বিয়ের ষাট বছর বাদেও আক্ষেপ করতে শুনেছি। সেই ওয়াছেল মোল্লার দোকানের গল্প পড়লাম বিভূতিভূষণের দিনিলিপিতে। এ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতেন তিনি। চাঁদনী চক থেকে কলেজ স্ট্রিট যাওয়ার পথে ডানহাতে সে-দোকান এখন বসতবাড়ি। নিচতলায় ছোট্ট একটা ঘরে ওয়াছেল মোল্লা গ্র্যান্ড সন্স-এ বৈদ্যুতিক পাখা, মাইক্রোওয়েভ ওভেন বিক্রি হয়। নাক-ফুল থেকে ওয়াশিং মেশিনে উন্নীত হলে কী হবে, আমার চোখে সাদা কালো কোলকাতায় রঙিন রঙ লেগে আছে। রঙটা শৈশবে পাওয়া বলে অক্ষত এখনও।
যাদবপুরে আমার আপাত বাসস্থান থেকে ঢাকুরিয়া অনতিদূর। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’র লেখক প্রবোধ কুমার স্যানাল থাকতেন ঢাকুরিয়ায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প-সংকলনে ‘ট্যাঙ্কি সাফ’ নামে ভয়ঙ্কর গল্পটাতে বলা আছে—ঢাকুরিয়ার জল ভালো না। সহজে চুল উঠে যায়। তার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়া যায় এখানকার অনেকদিনের বাসিন্দা অভিজিৎ মুখার্জিকে দেখলে। স্যার অ্যান্থনি হপকিন্সের মতো সাদা মুখ ও মাথা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন ঢাকুরিয়ার মোড়ে।
হারুকি মুরাকামির ‘সমুদ্রতটে কাফকা’-র অনুবাদক অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জি আর আমার অভিযান আজ পার্ক সার্কাসে। অভিযান শব্দটা রীতিমত আয়োজন করে সাথে সেঁটে দিয়েছেন ‘শাংগ্রিলার খোঁজে’র লেখক পরিমল ভট্টাচার্য। দুদিন আগে আমরা যোধপুর পার্কের এক কাফেতে বসেছিলাম। ‘তারকোভস্কির ঘরবাড়ি’ বইটা উপহার দেবার সময় লিখেছেন, ‘সাদিয়াকে কলকাতা অভিযানে স্বাগত’। পার্ক সার্কাসের গোপন অভিযানে বিপুল উত্তেজনা কাজ করছে কিন্তু দুজনই বেশ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছি।

অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জি এখানকার স্থায়ি বাসিন্দা হলেও ভৌগলিক জ্ঞান যে প্রায় আমার সমান, তিনি নিজে টের না পেলেও আমি আন্দাজ করেছি। তাই হয়ত পার্ক সার্কাসের এত বিশাল ঐতিহ্য থাকতেও একটি বাড়তি বাক্য মাস্টারমশাই খরচ করেন নি আসার আগে। আমি যখন জিপিএস দিয়ে কোনো ঠিকানা খুঁজি, তিনি তখন বিলবোর্ড পড়েন। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে বিলবোর্ড দেখতে দেখতে টের পেলাম দরগাহ্ রোডের ডন বসকো মোড়ে নামতেই কোথাও একটা কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। হাতের বাঁয়ে ঘুরে শুরু হয়েছে সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ। ট্যাক্সি থামতেই এক ঝাঁক পায়রা উড়ল হাওয়া বইয়ে দিয়ে। কে যেন পথের ওপরেই খানিকটা ধান ছড়িয়ে দিয়েছিল পাখিদের জন্য।
দেখলাম, এখানে বাড়িগুলোর ধরন বদলে বদলে যাচ্ছে। বাঙালি ধাঁচের বাড়ির তুলনায় মুঘল নকশার আধিক্য বেশি। অধিকাংশ জানালায় পর্দা টানা। ঝুল বারান্দার লোহার নকশায় লতাপাতার ছাঁচ। পথের ধারে জলের ট্যাপগুলোতে বাঘ-সিংহের মুখের আদল নেই, দরজার কাছে খোদাই করা চাঁদ-তারা। তুলসী গাছ চোখে এলো না একটাও, তবে কোলকাতার অন্য এলাকার মতো বেশ কিছু ছাতিম, বকুল আর নিম আছে। মোড়ের একপাশে ছোট দোকানে বিক্রি হচ্ছে নামাজ পড়ার কায়দা আর পাঁচ কলেমার বই। তারই সামনে কাগজ পেতে টুপি-আতর-সুরমা-গোলাপ জল নিয়ে বসেছেন এক দাড়িওয়ালা।
একই রকম আরেকটা ছোট মুখ সামনে ঝুঁকে বসেছে নীল শার্ট গায়ে দিয়ে। ছেলেই হবে। খদ্দের তেমন নেই দেখে ছেলের চোখে সুরমা দিচ্ছেন দোকানি। পাশ কাটিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেলেন দুই নারী। এখানে পথচারি হিসেবে নারীদের সংখ্যা একই রকম হলেও তাদের পোশাক পরিচ্ছদে আস্তরণের আভাস। কোলকাতায় এসে প্রথম কয়েকজন বোরখা পরিহিতাকে দেখলাম, সন্তান নিয়ে স্কুলে যাচ্ছেন। শাঁখা সিঁদুরের সংখ্যাও ক্ষীণ, চোখে পড়ে। তাদের শারীরিক গঠন সামান্য ভিন্ন। চওড়া হাড়, উচ্চতা আমাদের গড়পরতা নারীদের চেয়ে একটু বেশি।

কোলকাতা শহরের বাসিন্দাদের চোখে আকস্মিক এ-পার্থক্যগুলো বিশেষ চোখে পড়ার কথা না। আমার অনভ্যস্ত দৃষ্টিতে কিছু কিছু বিষয় নতুন। অভিজিৎ মুখার্জি জানালেন, অনেকেই কয়েক পুরুষ আগে বিহার, ইউ.পি. থেকে এসেছেন। তবে মুখ দেখলেই বোঝা যায়, ভালোবেসে মিশে যেতে কোথাও কমতি হয় নি। মাথায় ওড়না দিয়েই বেশ ধমকে ধমকে চেঁচিয়ে একে ওকে কী সব বলছেন এক নারী, গলির এক বাড়ির ভেতর থেকে। হুবহু পুরনো ঢাকার আগামসি লেনের কোনো দৃশ্য। একটু এগিয়ে গেলেই হয়ত পাওয়া যাবে বাখরখানির দোকান। এখানে বেশ কিছু মোঘল খাবারের রেস্তোরাঁ আছে। দু’একটা ছোট ছোট দরজির দোকান। ভেতরে হ্যাঙ্গারে ঝুলছে বুটিক করা সালোয়ার কামিজ। কানে পেন্সিল গুঁজে কাপড় কাটতে কাটতে গুনগুন করছেন দোকানদার। দোকান থেকে ভেসে আসছে পুরনো দিনের ভারতীয় হিন্দি গানের সুর।
সিপাহি বিপ্লবের পরপর নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে নির্বাসনে আনা হয়েছিল মেটিয়াবুরুজে। পার্ক সার্কাস থেকে সে অনেকটা দূর। মুসলমান অধ্যুষিত খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজে নবাব শুধু আলু দিয়ে বিরিয়ানির প্রচলনই করেন নি, পুরো কোলকাতায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শিল্প সংস্কৃতি। সেসবকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন এখানকার হিন্দু মুসলমান। পার্ক সার্কাসের ময়দানে বড় পূজার মণ্ডপে অনেক মুসলমানও আয়োজক হিসেবে উপস্থিত থাকেন। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে কায়সারবাগ থেকে কোলকাতা নিয়ে আসার দিন ভোরে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাবুল মোরা নৈহার ছুট হি যায়ে’ গানটি। আমার কাছে ভীমসেন যোশির কণ্ঠেই বেশি ভালো লাগে। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী’র ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’-র পর তাই অবলীলায় প্রবেশ করে ‘হায় রাম’ শব্দটি।
এখানে থাকতেন উস্তাদ বিলায়েত খাঁ, আমীর খাঁ। বিলায়েত খাঁর নামে একটা পার্কও আছে। তবে শঙ্খ ঘোষের ‘কলকাতার ভেতর আরেক কলকাতা’র মতো এই মুসলমান অধ্যুষিত পার্ক সার্কাসে আমাদের আজকের অভিযান সঙ্গীত নয়, অন্য কিছু। “সকল ফুলের কাছে এত মোহময় মনে যাবার পরেও মানুষেরা কিন্তু মাংস রন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে”। বিনয় মজুমদারের দর্শনের মতো মাংসের দোকান খুঁজে বের করাই আমাদের অভিযান।

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম হাজি সাহেবের মাংসের দোকান খুঁজতে। কিছুদূর যেতেই হাতের বাঁয়ে পড়ল ‘বু আলী শাহ কলন্দর’-এর মাজার। সেখান থেকে কাওয়ালীর সুর আসছে। পথের সাথে লাগোয়া দরজায় উঁকি দিয়ে দেখি বিশাল বাঁধানো উঠোন, একপাশে বড় চাপকল। ওরই ভেতর দিকে খোলামেলা এক সমাধি সবুজ গিলাফ দিয়ে ঢাকা । অন্যান্য মাজার বা সমাধিতে যেমন নারীদের চলাচলে বিধিনিষেধ রয়েছে, এখানে তেমন মনে হলো না। বেশ কজন নারী সামনের দিকে বসে আছেন, তবে সবারই মাথায় কাপড় রয়েছে। পার্ক সার্কাসে বেশ কিছু পুরনো মসজিদ আছে। অধিকাংশ নির্মিত হয়েছে নবাব সিরাজৌদোল্লার কোলকাতা দখল, টিপু সুলতানের বংশধরদের নির্বাসন আর বাদশা ওয়াজিদ আলি শাহ বন্দী হয়ে আসার সময়ে।
দুপুরের রোদ ঝিম ধরিয়ে দিচ্ছে। পথে হাঁটতে হাঁটতে পাওয়া গেল গোলাপি রঙের ঠাণ্ডা শরবত। দোকানি বলছেন এ বাদশাহী শরবত। সে-শীতল জল আামাদের আসল মোঘল আমলের স্বাদ দিল কি না বুঝতে পারলাম না, তাপদাহের মধ্যে প্রাণ জুড়িয়েছে। সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ যে আসলে এত দীর্ঘ পথ, আমরা ধারণা করি নি। এই সরণি অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে রয়ে গেলেও এর সাথে অ্যাভিনিউ সংযুক্ত হওয়ায় ঠিক প্রথমেই বোঝা যায় না। সোহরাওয়ার্দীর মামা হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাড়ি ছিল এখানে। সে-বাড়ি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভরে উঠত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে। একাত্তরের স্মৃতি জড়ানো এই বাড়ি থেকে তখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হতো মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের খবর। সেই বাড়িটি এখন বাংলাদেশ লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টার। এখানে এখনও দুর্লভ কয়েক হাজার বই আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ভেতর ৪৬-এর দাঙ্গা পর্বে এই পার্ক সার্কাসের প্রসঙ্গ এসেছে বহুবার।
সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ ধরে এগিয়ে গেলে এখনো আছে সেই লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ। দাঙ্গার সময়ে ওই কলেজে রিফিউজিদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের ‘কলেজ স্ট্রীটে সত্তর বছর’ বইয়ে স্মৃতিচারণার ভেতর রয়েছে, পার্ক সার্কাসে বিভূতিভূষণ আসতেন প্রায়ই। পার্ক স্ট্রিট থেকে হেঁটে সোজা পার্ক সার্কাস বিশেষ দূর নয়। তবে মুসলমান অধ্যুষিত এ এলাকা বরাবরই অমিতাভ ঘোষের ‘কলকাতা ক্রোমোজম’ বইয়ের মতোই বড্ড গোলমেলে। একসময় ট্রাম চলত এখানে, এখন নেই। বাঙালি-মুসলমান আচার, রীতি মিলেমিশে গিয়েও আবার মুসলমানের সংখ্যাধিক্য।
পুরনো পুরনো স্থাপত্যের মাঝখানে আকস্মিক উঠে গিয়েছে নতুন বহুতল ভবন। সৈয়দ আমির আলী অ্যাভিনিউয়ের চার রাস্তার মোড়টার পাশে কোলকাতার দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্কেট কোয়েস্ট শপিং মল। সরু গলির পুরনো ঘরবাড়ির ভেতর বিষফোঁড়ার মতো তৈরি হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের নতুন নতুন বাড়ি। সেই ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিভূতিভূষণ তাঁর দিনলিপিতে লিখেছেন “কি সুন্দর জ্যোছনা উঠেচে আজ! পার্ক স্ট্রীটের এদিকে কখনো আসিনি। বড় সুন্দর লাগছিল। বড় বড় রাস্তা - পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বাড়ীঘর – দোকানপসার - যেন বিলেতের শহরে বেড়াচ্চি। যেই পার্ক সার্কাসে ঢুকেচি - অমনি অপরিস্কার।”
গোটা কলকাতাই এখন অপরিচ্ছন্ন। কালীঘাটে আদিগঙ্গার ওই জলে গতকাল এক পুণ্যার্থীকে নাইতে দেখে আমার ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। শরীরে ইনফেকশন বাঁধিয়ে ভবলীলা সমাপ্ত করার আয়োজন করছে । অথচ নির্বিকারভাবে জানালেন, প্রতিদিনই এই স্নান তিনি করেন। আলাদা করে পার্ক সার্কাসের অপরিচ্ছন্নতা আর চোখে পড়ল না আমার। তবে সব মিলে এখানকার পরিবেশে যে সবকিছুর সংমিশ্রণ আছে তা টের পেলাম প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে। এইসব মানুষ, ঘরবাড়ি দেখতে দেখতে পেয়ে গেলাম হাজি সাহেবের মাংসের দোকান। তিনি হাজি এবং সাহেব দুটো উপাধিরই মর্যাদা রেখেছেন।
উপনিষদ থেকে ক্রমাগত আউড়ে যাওয়া ব্রাহ্মণ তখন পাশে দাঁড়িয়ে, সামনে ছুরি হাতে ক্রমাগত ইংরেজিতে কথা বলে যাচ্ছেন হাজি সাহেব। সাহেবই বটে। লুঙ্গির গিঁটটা উঁচু পেটেরও উপরে স্থান নিয়েছে। পান মুখে দিয়ে অনর্গল বিজাতীয় ভাষায় কথা বলে যাচ্ছেন স্বচ্ছন্দে।
এমন একটা গোলমেলে বিষয়ের ভেতর আমি নো-ম্যান’স ল্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মুখার্জি সাচ্চা মুসলমানের দোকানের গরুর মাংসের শর্তে অটুট না থাকলে পার্ক স্ট্রিটের ‘কালমান কোল্ড স্টোরেজ’-এ যেতাম। সেখানে অন্তত কুড়ি পদের মাংস তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয় শুনেছি। শস্তাগণ্ডা-র বাজার থেকে কেনাকাটা করে ইংরেজরা বলত ‘ড্যাম চিপ’ আর অনপড় মানুষেরা শুনত ‘ড্যাঞ্চি’। শুনেছি এখানে গরুর মাংস বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটা কমে বিক্রি হয়। ঠিক সাহেবদের মতোই ‘ড্যাম চিপ’ বলব বলে বেশ একটা স্মার্ট আচরণ করার আশা মনে মনে ছিল। হাজি সাহেবের ক্রমাগত ইংরেজি শুনে আমি ঢোঁক গিলে ফেলেছি। লুঙ্গি পড়ে হাতে ছুরি নিয়ে ক্রমাগত ইংরেজি বলা কসাই তো আগে আর দেখি নি, কী করা যাবে।
আমরা যতটা মাংস কিনলাম তার চেয়ে বেশি কথা শুনলাম। বিশ ফুট বাই বিশ ফুট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রথমে হাজি সাহেব ব্রাহ্মণ মাস্টারমশাইকে দেখে নিলেন, কোনওরকম সন্দেহ হলো না। আমারই কপাল খারাপ, চেহারায় যেন কী একটা আছে। প্রথম দেখায় যে কেউ বলে আমি হিন্দু বাড়ির মেয়ে। তিনি নিশ্চিত হতে চাইছেন সত্যি আমরা গরুর মাংস কিনতেই এসেছি না অন্য উদ্দেশ্য আছে? অগত্যা আমার মুখ থেকে বোনলেস, বোনসহ, সিনার মাংস শুনে একটু আশ্বস্ত হলেন, গরুর মাংসই কিনতে এসেছি। একগাল হাসি দিয়ে জানালাম, বাংলাদেশ থেকে আসা আমার পদবী কিন্তু ইমাম। অধ্যাপক মুখার্জি তখন নিপাট ভালো মানুষ মুখ করে আশপাশের দৃশ্য দেখছেন।
দাম মিটিয়ে ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে এলাম মুসলমান অধ্যুষিত পার্ক সার্কাস থেকে। ক্রমে আবার সেই দৃষ্টি-অভ্যস্ত বাঙালি বাড়ির এক চিলতে জানালা দেখা গেল গড়িয়াহাটার পথে। সেই বটগাছের তলে রাম, কৃষ্ণের ছবিতে সিঁদুরের দাগ। কলকাতা ক্রোমোজমের একটা খণ্ড চিত্র সেঁটে রইল চোখে মুখে।