জোছনা ভেজা চেমা খাল
লেখাঃ মাসুম সায়ীদ
শনিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৩আমাদের এবারের গন্তব্য চেমাখাল। বগালেকের দক্ষিণ ঢাল থেকে আধা ঘণ্টার পথ। এগারো মাইলেই জিপ ছাড়তে হল। পায়েল ওরফে মাইকেল নামে চটপটে চৌকস একটি ছেলে আমাদেরকে পথ দেখাচ্ছে। সঙ্গে একজন পোর্টার। জিপ থেকে নামার পরই শুরু হলো উৎরাই। এই পথও একসময় ইট বিছানো ছিল। এখন দানা-খসা ভুট্টার ছড়ার মতো। পানির ঢল পথের গা থেকে খুলে নিয়েছে ইট। পাহাড়ে ওঠার চাইতে নামা সহজ। কিন্তু এই উৎরাইটা এত দীর্ঘ যে নামার পর
একটু না বসলে চলে না কারও। উপত্যকায় দুটো দোকান। আমাদের আসার আগে থেকেই একটা দল অপেক্ষা করছিল যাত্রার। আমাদের পর আরও তিনটি দল এল। সবার গন্তব্য বগালেক। একে একে সবাই রওনা করার পর শুরু করলাম আমরা।
দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ট্রেকার মাউন্টেনিয়ার সিরাজুল ইসলাম সাগর ভাই। যিনি টিমের ব্যবস্থাপক। আমাদের পরিভাষায় কোয়াটার মাস্টার। দলনেতা সালাউদ্দিন ভাই। সহকারী তারই সহধর্মিণী উম্মে হাবিবা শশী। এ দম্পতির সঙ্গে এবারই আমার প্রথম পরিচয়। শশীকে ভাবি বলতেই উড়িয়ে দিলেন হেসে। তবে আপা? ‘না, আপা টাপাও না। স্রেফ নাম ধরে ডাকবেন।’ অন্যরাও সায় দিলেন। তারাও তাই করে। ব্যাপারটায় আমারও বেশ মজা লাগল। কিন্তু মুখে আসছিল না সহজেই। তাই আপাতত কথা চলল ভাববাচ্যে, সম্বোধন এড়িয়ে।
হাঁটছি তো হাঁটছিই। পথ আর সরে না। সবার ব্যাগ ছোট। আমিই শুধু গাধা। আকারণে বোঝা ভারি করেছি। এখন কিছু ফেলে দিতেও মায়া। টাকাও নষ্ট। তার ওপর যদি কাজে লাগে—এরকম ভাব। বগালেকের বেশ আগেই সন্ধ্যা নেমে গলে। পথের বাঁকে পাহাড়ি দুটো ছেলে-মেয়ে কিছু পেয়ারা আর একটা পেঁপে নিয়ে বসে ছিল। অগ্রবর্তীরা তার সদ্ব্যবহার ভালোই করেছে। আমরা যখন পৌঁছলাম তাদের কাছে তখন অল্প কিছু আছে ভাগে। একেবারে না পাওয়ার চেয়ে কিছু পাওয়া মন্দ না।

আবার শুরু হল হন্টন। ‘হণ্টন শুধু হণ্টন/ পথে যেতে যেতে দুঃখ যত/করে যেও বণ্টন।’ হুমায়ূন আহমেদের ‘চলে যায় বসন্তের দিন’ বইটার ফ্ল্যাপের লেখাটা মনে পড়ল অকারণেই। অবশেষে ঘোরলাগা সন্ধ্যার প্রান্তে দেখা মিলল বগালেকের পাদদেশের পাড়া। মিটিমিটি আলো। যে যেমন পারে গা ঢেলে বসে আছে। এরা সবাই বয়সে তরুণ। বয়স বিশ-বাইশের মধ্যেই হবে। তারপরও ক্লান্তিতে অবসন্ন। দোকানি ট্রেকারদের চাহিদা বোঝে। মর্তমান পাকা কলার কাঁদি ঝুলিয়ে রেখেছে দোকানের সামনে। ট্রেকাররা ব্যাগ রেখে যখন ধপাস করে বসে পড়ে, তখন দোকানি হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলে—শরবত আছে, দেব?
দ্বিতীয়বার কাউকে জিজ্ঞেস করতে হয় না শরবত দেবে কি না। দলের অন্যরা শরবত খাচ্ছিল, আমরা এসে যোগ দিলাম। মাত্র এক ঢোক পান করতেই শরীরটা জুড়িয়ে গেল! জিলানী ভাই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। চিয়ার্স করার ভঙ্গীতে বলে উঠলেন—‘আহ, অমৃত! বেহেশতি! বেহেশতি!! জনান্তিকে বলে রাখি জিলানী ভাইয়ের মনোমতো কিছু হলেই তিনি বলে উঠবেন—বেহেশতি! বেহেশতি!’ শরবত আর বিশ্রামপর্ব শেষ হলো। এবার আমদের ওঠার পালা। চেমাখাল বিশ মিনিটের পথ। ধরে নিলাম এর দ্বিগুণ লাগবে, চল্লিশ মিনিট। ব্যাপার না। পাড়ার আঙিনা থেকেই শুরু হয়েছে ইট বিছানো পথ। খাড়া ঢাল। ইটের গায়ে শ্যাওলা, তাই পথ খানিকটা পিচ্ছিল। পায়ে ‘আর্মি কমান্ডো বুট’। পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় কম। আমি পথের দিকে নজর না দিয়ে তাকালাম আকাশের দিকে।
আকাশে আজ শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ। সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় পূর্ণিমার চাঁদ যে কী অপূর্ব! এ রূপ বর্ণনার ভাষা বিধাতা আমাকে দেন নাই। আমার বারবার মনে হচ্ছিল মানুষ না হয়ে পাহাড়-চূড়ার যেকোনো একটা লতা হয়েও যদি জন্মাতাম! জানি না গাছ, লতাপাতারা চাঁদের আলোর মর্ম বোঝে কি না? আর বুঝবে না কেন? যদি না-ই বুঝবে, তাহলে এমন করে নিজের সুন্দরটুকু মেলে ধরবে কেন? নিশি-পাওয়া মানুষের মতো একটা ঘোরলাগা নিয়ে হাঁটছি। সবার হাতেই টর্চ-লাইট। তবে নেহাত দরকার না হলে জ্বালাচ্ছে না কেউ। চাঁদটাকে উপভোগ করছে সবাই। টুকটাক কথা বলা স্বাভাবিক ব্যাপার। যদিও এটাও এই মুহূর্তে আমার কাম্য নয়, তাই ইচ্ছে করেই সরে এলাম পেছনে। সবার পেছনে এখন সাগর ভাই, এমনিতে থাকেন সবার আগে। রাতের বেলা, তাই ইচ্ছে করেই রয়েছেন পিছনে। কিছুক্ষণ আগেও গান শুনছিলেন মুঠোফোনে। এখন নীরব। সম্ভবত নীরবতা উপভোগ করছেন। স্থপতি মানুষ তিনি। শিল্পচৈতন্য তাঁরও প্রখর।
একেবারে নৈঃশব্দ কোথাও নেই প্রকৃতিতে। আশা করাও ঠিক না। ঝিঁঝি পোকারা মাতিয়ে তুলেছে রাতটাকে। সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আমাদের পায়ের আওয়াজ। কিছুক্ষণ বাদে বাদে দূর থেকে ভেসে আসছে ঈগল পাখির ডাক। ব্যথাতুর সে কণ্ঠ। হয়তো প্রিয়া হারানোর ব্যাকুলতা, নিঃসঙ্গ বুকের কান্না। তাই বাতাসে ঢেলে হয়তো হালকা করছে বুক। ডাকটা বগালেকের দিক থেকে আসছে। গত বছর বগালেকের পুবপাশের পাহাড়-চূড়ায় একটা বড় গাছের মগডালে দেখেছিলাম ঈগলের বাসা। সম্ভবত সেই পাখিটা। ঈগল পাখিরা একটা বাসা দীর্ঘদিন ব্যবহার করে। জীবনানন্দ দাশ চিলের ডাক নিয়ে তো অনেক লিখেছেন। ঈগল নিয়ে কিছু লেখেন নি? এবার খুঁজে দেখতে হবে ফিরে।
সামনে একটা ঝিরি। দলের সবাই দাঁড়িয়ে পড়েছে। গাছের ছায়া এত ঘন যে চাঁদের আলো ঝিরির জলে পৌঁছে নি। আহ বেচারা! এমন চাঁদের চুমো তুমি পেলে না। একে একে পার হয়ে গেলাম সবাই। ছোট্ট এক চিলতে ঝিরি। পা না-ভিজিয়ে পাথরে পা রেখে রেখে পার হলো কেউ কেউ।
পথে পড়ল একটা ‘ওয়াই সংযোগ’। দুটো পথ দু-পাড়ায় গেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য থামতে হলো দলপতি আর তার পত্নীকে। এর মধ্যে দুজন পথচারী পাওয়া গেল। তারা বাতলে দিলেন পথ। আমরা নাকবরাবর এগিয়ে গিয়ে পাঁচ-সাত মিনিটের মাথায় পাড়ার একটা বাতি দেখলাম। পাহাড়ে দিনশেষে ক্লান্ত শরীরে যখন একটা ঘর চোখে পড়ে—সে ঘরটা যারই হোক—কী যে শান্তির! বলে বোঝানো যাবে না।
খানিক বাদেই আশ্রয় মিলল। কারবারির ঘরেই। কারবারির নাম লেংপুং। তার নামেই পাড়ার নাম—লেংপুং পাড়া। এরা ম্রো আদিবাসী। পায়েল ম্রো ভাষা ভালোই জানে। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামলেই ক্লান্তি কমে যায় অর্ধেক। ঘর থেকে পথে নামার চব্বিশ ঘণ্টা পর ঘর মিলল। উনুনের নেভানো আগুন আবার জ্বলল। হাঁড়ি চড়ল। মধ্যরাতের কাছাকাছি আমাদের পাত পড়ল। তারপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে গা মেলে দিলাম বাঁশের মাচায়। পিঠের নিচে পাতার জন্য একপ্রস্থ বিছানা সবারই সঙ্গে থাকে, কিন্তু বালিশ থাকে না সব সময়ে। যাদের ছিল না তাদের জুটল কাষ্ঠখণ্ড। ফিরে এসে যখন কষ্টের এ-গল্প বলি বন্ধুদের, তখন সবাই এমনকি ঘরের মানুষটাও বলে—তবে যাই কেন পাহাড়ে এমন কষ্ট করতে? কেন যে যাই, তা কি নিজেরাই জানি?
রাত ভোর হতে না হতেই ঘুম ভাঙল। প্রাতঃকৃত্য করতে যেতে হবে বাইরে। এর জন্য ঝিরির ধারটাই উত্তম। আড়াল আর প্রক্ষালনের পানি দুটোই মিলবে। এখন আপাতত অজু করা দরকার ফজরের নামাজ পড়ার জন্য। বর্ষায় পাহাড়ে সুবিধা পানির। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা সব ঘরে থাকে। পানির জন্য কার্পণ্য করতে হয় না। শুকনো মৌসুমে পানি পিঠে করে বয়ে আনতে হয়ে দূরের ঝরনা বা ঝিরি থেকে। ঝিরির পানিতে সাধারণ কাজ সারলেও পাহাড়িরা ঝরনার পানি ছাড়া খায় না। ‘টোয়া’তে থাকে খাবার পানি। কলাপাতায় বানানো পানের খিলির মতো ছিপি। আর বোতলে থাকে ঝিরির পানি। বোতলের পানিতে অজু সেরে, নামাজ পড়ে আরেক দফা গা গড়ালাম।
কিন্তু ঘুম এল না। মাথায় এল অন্য চিন্তা। ঝিরির ধারে গিয়ে সকালের সূর্য ওঠা দেখলে মন্দ হয় না। যেই ভাবা সেই কাজ। বেরিয়ে এলাম। হালকা কুয়াশা। প্রকৃতির সবকিছু শান্ত সমাহিত। শুধু ঝিরিটা ছাড়া। কিশোরীর মতো চঞ্চল স্বভাব তার। হাঁটতে গিয়ে যেন ছুটছে। আস্তে আস্তে গিয়ে দাঁড়ালাম পানির ধারে বড় একটা পাথরের ওপর। সূর্য এখনও পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকিয়ে। পাথর ছেড়ে ঝিরির পানিতে পা রাখলাম। আচমকা একটা শিহরন খেলে গেল সারা গায়ে। যেন প্রথম পরশ কুমারীর থরথর। কত বারই তো পাহাড়ি ঝিরিতে নেমেছি, তারপরও কেন এমন হয় বারবার?
হাঁটতে থাকলাম কলরব করা স্রোতের ধারার সঙ্গে। ছোট, বড় আর নুড়িপাথরে ভরা ঝিরির বুকটা। কিছুদূর গিয়ে ঝিরিটা বাঁক নিয়েছে পশ্চিমে। এখানকার সবচেয়ে উঁচু চূড়াটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই পাহাড়ের মাঝে সূর্য উঁকি দিতে দেখে আমি একটি পাথরের উপর বসে পড়লাম, সূর্যের দিকে মুখ করে। দেখতে দেখতে শিশিরবিন্দু হীরের কুচিতে পরিণত হলো। স্বচ্ছ জলের নিচে বালি, পাথরকুচিরা হেসে উঠল। আমি বসে থাকলাম নিজেকে হারিয়ে।
সূর্য তেতে উঠল। আমি পাশ ফিরলাম। মিঠেলা রোদ গায়ে মাখতে ভালো লাগছে। পানির কলকল শব্দে থমকে গিয়েছিল সময়। কারো পায়ের শব্দে সম্বিত ফিরল। পিছনে তাকিয়ে দেখি গুলতি হাতে দুটো পাহাড়ি ছেলে। সাত সকালেই নেমেছে শিকারে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি কাঁটা পৌনে আটের কাছাকাছি। জানি, এখনও দলের কারও ঘুম ভাঙে নি। তবু কেন জানি মনে হলো ফেরা দরকার। ফিরছি ঝিরি ধরেই। আজ আমাদের কোনও তাড়া নেই। দিনটা ঝিরিতেই কাটাব দল বেঁধে। তার আগে এক কাপ লাল চা।